প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে থাকলেও নদীর দক্ষিণ তীরের চরাঞ্চলে পানি ঢুকে পড়ায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। বিশেষ করে চরখিদিরপুর, খানপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন চরে নিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও ঘরবাড়ির উঠান, চলাচলের পথ ও কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে বিপৎসীমার নিচে নদীর পানি থাকলেও চরবাসীর কাছে পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগের হয়ে উঠছে।
শুক্রবার সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীর বড়কুঠি পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৭ দশমিক ২০ মিটার। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার শূন্য দশমিক ৮৫ মিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নদীর পানি বাড়ার গতি আপাতত খুব বেশি নয়। কিন্তু নদীর চরাঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও নিচু অবস্থানের কারণে বিপৎসীমা অতিক্রম না করেও এসব এলাকায় পানি প্রবেশ করছে।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের মিটারগেজ রিডার এনামুল হকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ১৫ মিটার। শুক্রবার সকাল ৯টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ২০ মিটারে। অর্থাৎ প্রায় ১৫ ঘণ্টায় পানির উচ্চতা বেড়েছে ৫ সেন্টিমিটার। স্বাভাবিকভাবে এই বৃদ্ধির হারকে খুব দ্রুত বলা না গেলেও চরাঞ্চলের মানুষের জন্য সামান্য পানি বৃদ্ধিও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
কারণ পদ্মার দক্ষিণ তীরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল নদীর পানির স্বাভাবিক ওঠানামার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। নদীতে পানি বাড়লে প্রথমেই ডুবে যায় নিচু চর, কৃষিজমি, বসতবাড়ির আশপাশের নিচু জায়গা এবং স্থানীয় যোগাযোগের পথ। ফলে শহর বা অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকার মানুষের কাছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলেও চরের মানুষের দৈনন্দিন জীবন দ্রুত কঠিন হয়ে ওঠে।
গত কয়েক দিনে চরখিদিরপুর ও মিডল চরের পরিস্থিতি এরই মধ্যে সেই বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেছে। পানি বাড়তে থাকায় অনেক বাড়ির উঠান ডুবে গেছে, কোথাও কোথাও বসতঘরের ভেতরেও পানি ঢুকে পড়েছে। কয়েকটি পরিবার গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নৌকায় করে নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চরখিদিরপুরের মানুষের দুর্ভোগের আরেকটি বড় দিক হলো বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট। চারপাশে পানি উঠে গেলে নিরাপদ পানির উৎস ব্যবহারের সুযোগ কমে যায়। রান্নার জ্বালানি ও খাদ্যসংকটও তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে শিশু, নারী, বয়স্ক মানুষ এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য পানিবন্দি অবস্থায় স্বাভাবিক জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
চরের বাসিন্দাদের কাছে গবাদিপশু শুধু সম্পদ নয়, অনেক পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। তাই পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের নিরাপত্তার পাশাপাশি গরু-ছাগলসহ গবাদিপশু রক্ষার চিন্তাও বাড়ে। অনেক পরিবার শেষ সম্বল হিসেবে থাকা গবাদিপশুগুলোকে নৌকায় করে উঁচু জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা করছে। এতে একদিকে নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন হচ্ছে, অন্যদিকে পশু রাখার জায়গা, খাবার ও পানির ব্যবস্থাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, পানিবন্দি অবস্থায় রাত কাটানোর সময় সাপ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর আতঙ্কও বাড়ছে। পানির কারণে ঘরের আশপাশের স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে যাওয়ায় বসতঘরে বিষাক্ত প্রাণী ঢোকার আশঙ্কা থাকে। শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও পরিবারের সদস্যদের বাড়তি সতর্ক থাকতে হচ্ছে। ফলে নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও চরবাসীর কাছে প্রতিটি দিন অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে কাটছে।
এরই মধ্যে পানিবন্দি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে রাজশাহী জেলা প্রশাসন। চরখিদিরপুর ও মিডল চরের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে শুকনো খাবারসহ বিভিন্ন ধরনের ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পানিবন্দি মানুষের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে চরাঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন পদ্মার পানির পরবর্তী গতিপ্রকৃতি নিয়ে। পানি যদি আরও বাড়তে থাকে, তাহলে বর্তমানে প্লাবিত নিচু এলাকাগুলোর বাইরে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে যেতে পারে। ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশের পাশাপাশি কৃষিজমি, রাস্তা ও স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থায়ও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চলে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীভাঙনের আশঙ্কাও তৈরি হয়।
রাজশাহীর চরাঞ্চলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পদ্মার পানি বাড়লে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। নদীর সঙ্গে বসবাস করা এসব মানুষের জীবনযাত্রা তাই প্রকৃতির পানি ওঠানামার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। একদিকে নদীর পানি তাদের কৃষি ও জীবিকার সুযোগ তৈরি করে, অন্যদিকে অতিরিক্ত পানি মুহূর্তেই সেই জীবিকার ওপর আঘাত হানতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নদীর পানির প্রবণতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং চরাঞ্চলের মানুষের কাছে দ্রুত তথ্য পৌঁছে দেওয়া। পানি এখনো বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার নিচে থাকায় বড় ধরনের বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—এমনটি বলার সুযোগ নেই। তবে নিম্নাঞ্চল ও চর ইতিমধ্যে প্লাবিত হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে দুর্ভোগকে ছোট করে দেখারও সুযোগ নেই।
পদ্মার পানি সামান্য বাড়লেও চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় তার প্রভাব দ্রুত দৃশ্যমান হয়। তাই নদীর পানি কোন দিকে যাচ্ছে, কতটা বাড়ছে বা কমছে এবং আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতির কী পরিবর্তন হতে পারে—এসব বিষয়ে নিয়মিত নজর রাখা জরুরি। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, খাবার, চিকিৎসা ও গবাদিপশু রক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে থাকা স্বস্তির খবর হলেও দক্ষিণের চরাঞ্চলের বাস্তবতা সেই স্বস্তিকে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে দিচ্ছে না। পদ্মার বুকের পানি এখনো সীমার নিচে, কিন্তু সেই পানির ঢেউ ইতোমধ্যেই চরবাসীর ঘরের উঠান ছুঁয়ে গেছে। পানি আর কতটা বাড়বে, নাকি দ্রুত কমে গিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে—সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছেন রাজশাহীর পদ্মাপারের মানুষ।