প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার বেলগাছা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিএম কলেজের ৩০ শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগ ও বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব অভিযোগ তুলে সংশ্লিষ্টদের নেওয়া বেতন-ভাতার প্রায় ১০ কোটি ২৮ লাখ ১২ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিধি অনুসরণ না করা, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ না করা, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সনদ গ্রহণের শর্ত পূরণ না করা এবং একজন শিক্ষকের দাখিল করা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ জাল প্রমাণিত হওয়ার মতো বিষয় পাওয়া গেছে। এসব কারণে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের নেওয়া বেতন-ভাতার অর্থ ফেরতযোগ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অডিট প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ এবিএম মোস্তফা কামাল দাবি করেছেন, নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অনেক অসংগতি ও ভিত্তিহীন অভিযোগ রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের চাওয়া অনুযায়ী তারা ব্রডশিট জবাব দিয়েছেন। ফলে বিষয়টি এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ এবিএম মোস্তফা কামালের নিয়োগ বিধিসম্মত হয়নি বলে আপত্তি তোলা হয়েছে। তাঁর নেওয়া ৬৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা বেতন-ভাতা সরকারি কোষাগারে ফেরতযোগ্য বলে সুপারিশ করা হয়েছে। একইভাবে সহকারী অধ্যাপক আনিছুর রহমানের ৫৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা এবং মনজুর কাদেরের ৫৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা ফেরতের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রভাষক জাহাঙ্গীর আলমের ৪৫ লাখ ২২ হাজার টাকা, নাজমুল হাসানের ২৮ লাখ ২৬ হাজার টাকা, মাহফুজুল ইসলামের ২৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা, ফরিদুল ইসলামের ২৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা, মোস্তফা কামালের ২৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং শাহজাহান কবীরের ২৫ লাখ ৫৩ হাজার টাকা ফেরতযোগ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারিগরি শাখার কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মচারীর নিয়োগ ও যোগ্যতা নিয়েও আপত্তি তোলা হয়েছে। ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর ওমর ফারুকের নেওয়া ৩৭ লাখ ৪ হাজার টাকা, রুমানা আক্তারের ৩৬ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, আফরোজা আক্তারের ৩৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, রুবিনা ইয়াসমিনের ৩৫ লাখ ৩১ হাজার টাকা এবং এসএম আবু হাশেমের ৩৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সহকারী শিক্ষক আবদুল আলীমের ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা, ফাহমিদা আক্তারের ১৮ লাখ ২৯ হাজার টাকা, ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর হেদায়েত উল্লাহর ১৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা, আকতার হোসেনের ১৪ লাখ ৯৫ হাজার টাকা এবং প্রদর্শক ফয়জুর রহমানের ১৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মাধ্যমিক শাখার আরও কয়েকজন শিক্ষকের বেতন-ভাতার ক্ষেত্রেও নিরীক্ষা আপত্তি রয়েছে। সহকারী প্রধান শিক্ষক সামছুল আলমের ২৯ লাখ ৭৬ হাজার টাকা, আলতাফুর রহমানের ৩৯ লাখ ৮৩ হাজার টাকা, শেখ আবদুল্লাহ আল মতিনের ৩৯ লাখ ৪১ হাজার টাকা, আবু বকর ছিদ্দিকের ৩৬ লাখ ৩ হাজার টাকা, রফিকুল ইসলামের ৩৬ লাখ ৩ হাজার টাকা, নয়া মিয়ার ৩৫ লাখ ৯৮ হাজার টাকা, তরিকুল ইসলামের ৩৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকা এবং রমজান আলীর ৩৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে।
সহকারী গ্রন্থাগারিক আব্দুল হকের যোগ্যতা নিয়েও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আপত্তি তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন লাইব্রেরি অ্যান্ড ইনফরমেশন সায়েন্স সনদ অর্জন করেছেন। কিন্তু নির্ধারিত তিন বছরের মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা ইউজিসি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে লাইব্রেরি সায়েন্সে ডিপ্লোমা অর্জনের শর্ত পূরণ হয়নি। এ কারণে তাঁর নেওয়া ১৬ লাখ ৩ হাজার টাকা বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিএম শাখার প্রভাষক কম্পিউটার শাহজাহান কবীরের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও নিরীক্ষা আপত্তি রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি ২০১৩ সালে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ইন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সনদ অর্জন করেন। তবে তাঁর যোগ্যতা ও সংশ্লিষ্ট নিয়োগের শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে। এ কারণে তাঁর নেওয়া ২৯ লাখ ৬৬ হাজার টাকা ফেরতযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি উঠেছে সহকারী অধ্যাপক আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর দাখিল করা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ জাল প্রমাণিত হয়েছে। এ কারণে তাঁর নিয়োগ বিধিসম্মত হয়নি এবং সরকারি বেতন-ভাতা পাওয়ার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে তাঁর নেওয়া ৬১ লাখ ২৭ হাজার টাকা ফেরতযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরবর্তী সময়ে নেওয়া অর্থও ফেরতযোগ্য হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া মাধ্যমিক শাখার সহকারী শিক্ষক শিরিনা আক্তারের উচ্চতর স্কেলে বেতন-ভাতা গ্রহণের বিষয়েও নিরীক্ষা আপত্তি রয়েছে। তিনি ২০০৪ সালের ১৯ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। কর্মরত অবস্থায় ২০১০ সালে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ২০১২ সালের ১ নভেম্বর থেকে বিএড সুবিধায় উচ্চতর স্কেলে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন। কিন্তু নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড না থাকায় তিনি ওই উচ্চতর স্কেলের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন। ফলে ২০১২ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নেওয়া ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
একই কারণে সহকারী শিক্ষক জাকিয়া সুলতানার উচ্চতর স্কেলে পাওয়া বেতন-ভাতার বিষয়েও আপত্তি তোলা হয়েছে। সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড না থাকায় তাঁরও ওই সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর নেওয়া ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের এসব বিষয় নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনও অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। দুদক সমন্বিত কার্যালয় জামালপুরের উপপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, অভিযোগটির অনুসন্ধানের অনুমতি চেয়ে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে চিঠি দেওয়া হবে। অনুমোদন পাওয়া গেলে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জামালপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মুজাহিদ বিল্লাহ ফারুকী বলেছেন, শিক্ষকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশায় থেকে কেউ অনিয়ম বা দুর্নীতিতে জড়িত হয়ে থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি শাহ মো. জুবায়ের জানিয়েছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে দ্রুত ব্রডশিট জবাব দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শামছুল আলম বলেন, আগে অডিট আপত্তির জবাব জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে পাঠানো হতো। সে সময় সরকারি কোষাগারে ফেরতযোগ্য টাকা জমা দেওয়ার পর অভিযুক্তদের জবাব গ্রহণ করা হতো। বর্তমানে এ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, অভিযুক্তরা সরাসরি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে জবাব দেবেন। জবাব সন্তোষজনক না হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আফসানা তাসলিম জানিয়েছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর থেকে বিষয়টি তাদের জানানো হয়েছে। নির্ধারিত কোডের মাধ্যমে অভিযুক্ত শিক্ষকরা অবৈধভাবে উত্তোলিত বেতন-ভাতার অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেবেন। সরকারি অডিট আপত্তির জবাব বা অন্য কোনো বিষয়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করবে।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলা হলে তারা বিস্তারিত কোনো বক্তব্য না দিয়ে জানান, এ বিষয়ে যা বলার অধ্যক্ষ বলবেন। অন্যদিকে অধ্যক্ষ এবিএম মোস্তফা কামাল নিরীক্ষা প্রতিবেদনের কিছু অভিযোগকে অসংগতিপূর্ণ ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তবে তিনি জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ যেভাবে জবাব চেয়েছে, সেভাবেই তারা ব্রডশিট জবাব দিয়েছেন।
জামালপুরের জেলা প্রশাসক ইউসুপ আলী বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শেখানোর দায়িত্ব যাদের ওপর, তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ ওঠা দুঃখজনক। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এখন পুরো বিষয়টির পরবর্তী ধাপ নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের দেওয়া জবাব, নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষের মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন হলে অনুসন্ধান ও তদন্তের ফলাফলের ওপর। অডিট আপত্তিতে যেসব অর্থ ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে, তা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে কারও বিরুদ্ধে সনদ জাল বা নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা থাকলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও বিধি অনুসরণের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কারণ একটি নিয়োগের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চাকরির ওপর পড়ে না; এর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহারের বিষয়ও জড়িত। বেলগাছা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিএম কলেজের নিরীক্ষা আপত্তির বিষয়টি তাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর যাচাই ও সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।