প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে টেকসই করতে রাজনীতিতে ভালো, সৎ ও মেধাবী মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান। তিনি বলেছেন, একটি দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা বড় বড় প্রকল্পের ওপর নির্ভর করে না; সেই উন্নয়নকে দীর্ঘস্থায়ী করতে প্রয়োজন যোগ্য ও সৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
মন্ত্রী বলেন, ভালো রাজনীতিবিদ তৈরি করতে না পারলে ভবিষ্যৎ নিয়ে যত বড় স্বপ্নই দেখা হোক না কেন, তা টেকসই করা কঠিন হবে। তাই দেশের রাজনীতিতে মেধাবী, যোগ্য ও নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
শুক্রবার জাতীয় সংসদ ভবনে বরিশাল ডিভিশনাল জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিডিজেএ) আয়োজিত ‘আগামীর বরিশাল বিভাগ: সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
সেমিনারে বরিশাল বিভাগের সম্ভাবনা, উন্নয়ন, নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে দেশের সামগ্রিক অগ্রগতির সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মানের সম্পর্ক তুলে ধরেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায় রাজনীতিতে তরুণ ও মেধাবী প্রজন্মের অংশগ্রহণ এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা।
আন্দালিব রহমান বলেন, দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছানো দরকার, যেখানে গুণগত পরিবর্তনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আর সেই গুণগত উন্নয়ন আনতে হলে ভালো মানুষের নেতৃত্বে আসা প্রয়োজন। তাঁর মতে, নেতৃত্বের গুণগত মান উন্নত না হলে উন্নয়নের নানা উদ্যোগ প্রত্যাশিত স্থায়িত্ব পাবে না।
তিনি বলেন, একটি দেশের অর্থনীতি যতই শক্তিশালী হোক কিংবা উন্নয়ন প্রকল্প যতই বড় হোক, সেগুলো পরিচালনা ও বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রয়োজন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি সততা, মেধা ও জনকল্যাণের মানসিকতা থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে দীর্ঘমেয়াদে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
মন্ত্রী দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় নেতৃত্বের সংকটের কথাও তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য, গত ১৭ বছরে দেশে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এ সময়ে অনেক ভালো ও মেধাবী তরুণ রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছেন। ফলে রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক ধরনের অনাস্থা তৈরি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আন্দালিব রহমান বলেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে অনেক রাজনীতিবিদের সন্তানও রাজনীতিতে আসতে আগ্রহী নন। রাজনীতির প্রতি এই অনাগ্রহকে তিনি দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, রাজনীতিকে যদি মানুষের কল্যাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে সেখানে সৎ, যোগ্য ও মেধাবী মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি।
রাজনীতির গুরুত্ব বোঝাতে মন্ত্রী একটি রান্নার উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, ভালো উপাদান থাকলেও দক্ষ বাবুর্চি না থাকলে ভালো খাবার তৈরি করা সম্ভব নয়। একইভাবে দেশে ভালো সম্পদ, সম্ভাবনা ও উন্নয়নের সুযোগ থাকলেও সেগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য যোগ্য নেতৃত্ব প্রয়োজন। ভালো মানুষ নেতৃত্বে না এলে উন্নয়ন ও অগ্রগতির সুফল টেকসই করা সম্ভব হবে না।
তাঁর এই বক্তব্যে মূলত রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুণগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে আসে। শুধু রাজনৈতিক পদ বা ক্ষমতার অবস্থান নয়, একজন নেতার সততা, দক্ষতা, দূরদর্শিতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই রাষ্ট্র ও সমাজের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
সেমিনারে বরিশাল বিভাগের ঐতিহাসিক ও সামাজিক গুরুত্বের বিষয়টিও উঠে আসে। আন্দালিব রহমান বলেন, বরিশালের ঐতিহ্য অতুলনীয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ক্রীড়া থেকে রাজনীতি—বিভিন্ন অঙ্গনে বরিশাল এবং বরিশালের মানুষ দেশের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
তিনি বলেন, পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পর্যন্ত বরিশাল অঞ্চল থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা উঠে এসেছেন। তাঁরা দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, সামাজিক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এই ঐতিহ্যকে সামনে রেখে আগামী দিনের বরিশালকে আরও সম্ভাবনাময় করে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
বরিশালের সম্ভাবনা নিয়ে আয়োজিত সেমিনারে স্থানীয় উন্নয়ন, মানুষের প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের বিষয়টি তাই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। একটি অঞ্চলের উন্নয়ন শুধু সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ নেতৃত্ব, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মধ্য দিয়েও উন্নয়নের ভিত শক্তিশালী হয়।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো বরিশালেও তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা কার্যক্রম এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এই পরিবর্তনকে কাজে লাগাতে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের মধ্যেও নতুন চিন্তা ও দক্ষতার প্রয়োজন রয়েছে। তরুণদের জন্য এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যেখানে তারা নিজেদের মেধা ও সৃজনশীলতা দেশের কাজে ব্যবহার করার সুযোগ পাবে।
রাজনীতিতে ভালো মানুষের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মান, জবাবদিহি এবং জনসম্পৃক্ততা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে রাজনৈতিক দল ও নেতাদের ভূমিকা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নির্ধারণ থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন পর্যন্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পড়ে।
একজন রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত সততা ও নৈতিক অবস্থান শুধু তাঁর নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না, বরং তাঁর নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও দলের ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই রাজনীতিতে যোগ্য মানুষের অংশগ্রহণ বাড়লে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে তরুণদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে আস্থা পুনর্গঠন গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ প্রজন্ম যদি মনে করে রাজনীতি মানুষের কল্যাণে কাজ করার একটি কার্যকর মাধ্যম, তাহলে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধ বাড়তে পারে। বিপরীতে রাজনীতিকে যদি কেবল ক্ষমতা বা ব্যক্তিগত স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়, তাহলে মেধাবী তরুণদের দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
সেমিনারে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর বক্তব্যে তাই শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমালোচনা নয়, ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক প্রত্যাশার কথাও উঠে এসেছে। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, দেশের উন্নয়নকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে ভালো মানুষকে রাজনীতিতে আসতে হবে এবং নেতৃত্বের গুণগত মান বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বরিশালের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক অবদানকে সামনে রেখে নতুন প্রজন্মের যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব তৈরি হলে এই অঞ্চলের উন্নয়ন আরও গতিশীল হতে পারে—এমন প্রত্যাশাই সেমিনারের আলোচনায় প্রতিফলিত হয়েছে।
দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সঠিক নেতৃত্ব তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাই জোর দিয়ে বলেছেন আন্দালিব রহমান। তাঁর মতে, ভালো রাজনীতিবিদ তৈরি করা গেলে উন্নয়ন ও অগ্রগতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। আর সেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি হয় সৎ, দক্ষ, মেধাবী ও জনকল্যাণমুখী, তাহলে দেশের উন্নয়ন শুধু দৃশ্যমান নয়, দীর্ঘস্থায়ীও হতে পারে।