ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩০ বার
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধ এবং দেশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে দেশের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, একটি দেশের পরিবর্তন শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়; রাষ্ট্র ও সমাজের পরিবর্তনের জন্য নাগরিকদেরও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে। সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করলে দেশের বড় বড় সমস্যাও মোকাবিলা করা সম্ভব।

শনিবার সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় দেশব্যাপী ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিন মাসব্যাপী এই কর্মসূচির লক্ষ্য ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতার অভ্যাস গড়ে তোলা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের পরিবর্তন আনতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সবাই মিলে দেশ গঠন করতে চাইলে কোনো বাধাই সেই অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে রাখতে পারবে না। তাঁর আহ্বানের কেন্দ্রে ছিল নাগরিক দায়িত্ববোধ। ডেঙ্গুর মতো একটি রোগ মোকাবিলায় শুধু হাসপাতাল, চিকিৎসক বা সরকারি সংস্থার ওপর নির্ভর না করে প্রত্যেক পরিবার ও নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় আগামী তিন মাসকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, এই সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। শতভাগ সমাধান সম্ভব না হলেও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা থাকবে। সরকারের এই উদ্যোগের সঙ্গে জনগণের অংশগ্রহণ যুক্ত হলে তা আরও কার্যকর হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

দেশকে পরিচ্ছন্ন রাখার সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, আঙিনা, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র কিংবা বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশার লার্ভা জন্মাতে পারে। ফলে বড় কোনো কর্মসূচির পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারকে নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘নিজেকে সুস্থ রাখি, সমাজকে সুস্থ রাখি।’ তিনি মনে করেন, প্রত্যেকে যদি সপ্তাহে মাত্র এক ঘণ্টা করে পরিচ্ছন্নতার জন্য সময় দেন, তাহলে পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব। তাঁর এই আহ্বান মূলত পরিচ্ছন্নতাকে কেবল সরকারি কর্মসূচি হিসেবে না দেখে দৈনন্দিন নাগরিক অভ্যাসে পরিণত করার ওপর জোর দেয়।

যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা না ফেলার জন্যও সবাইকে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, পরিচ্ছন্ন দেশ গড়তে প্রত্যেক নাগরিকের ভূমিকা রয়েছে। শুধু রাস্তা বা সরকারি জায়গা পরিষ্কার করলেই হবে না; ঘরের ভেতর থেকে শুরু করে আশপাশের পরিবেশও পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। কারণ এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হলে তা কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং আশপাশের মানুষের জন্যও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

সরকারের নেওয়া এই কর্মসূচির পরিধিও বেশ বিস্তৃত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাস দেশব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। প্রতি শনিবার দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান চালানোর পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। একই সময়ে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা প্রশাসনও কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

দেশের ৬৪টি জেলা ও ৫০৩টি উপজেলা, ৩৩০টি পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশন পর্যায়ে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, স্কাউট, রোভার স্কাউট, বিএনসিসি, রেড ক্রিসেন্ট, গার্লস গাইড, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের স্বেচ্ছাসেবক এবং অন্যান্য সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতির কারণে সরকারের এই উদ্যোগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে জানিয়েছেন, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৪৫ হাজার ৪৭৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে ১৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৩ হাজার ২০০ রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি সতর্ক করেছেন, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাস ডেঙ্গুর জন্য বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ সময়।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ সময় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই রোগী বাড়ার পর চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ডেঙ্গুর চিকিৎসার পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে যাতে নতুন করে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্বেগজনক এলাকাগুলোর উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা শয্যা প্রস্তুত রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও স্যালাইন পর্যাপ্ত রাখার কথা জানিয়েছে সরকার।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো মানুষের সচেতনতা। মশা নিধনের ওষুধ ছিটানো বা পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের কার্যক্রমের পাশাপাশি যদি বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করা না হয়, তাহলে এডিস মশার প্রজনন বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সরকারি ব্যবস্থার সঙ্গে নাগরিকদের দৈনন্দিন অভ্যাসের পরিবর্তন জরুরি।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে নাগরিক অংশগ্রহণের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, দেশের মানুষ তখন পরিবর্তন সম্ভব—এটি দেখিয়েছে। এবার রাষ্ট্রকে পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর এই বক্তব্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিবর্তনের পাশাপাশি নাগরিক দায়িত্ব ও সামাজিক আচরণ পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাও উঠে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর মতো জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মশার প্রজননস্থল অনেক সময় মানুষের বসতবাড়ি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির মধ্যেই তৈরি হয়। সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসনের কর্মীরা সব জায়গায় নিয়মিত পৌঁছাতে না পারলেও বাসিন্দারা নিজের বাড়ির পরিবেশ প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।

এই বাস্তবতায় সপ্তাহে এক ঘণ্টা পরিচ্ছন্নতার প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানটি সাধারণ মানুষের জন্য একটি সহজ নাগরিক দায়িত্বের বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিবারভিত্তিক সচেতনতা তৈরি হলে তা ধীরে ধীরে পাড়া-মহল্লা এবং বৃহত্তর সমাজে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, অফিস, বাজার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা চর্চা ডেঙ্গুর পাশাপাশি অন্যান্য রোগের ঝুঁকিও কমাতে সহায়ক হতে পারে।

দেশের কয়েকটি অঞ্চলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি বলে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বিশেষ করে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এসব এলাকায় এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অন্যান্য এলাকাতেও পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তিন মাসব্যাপী এই কর্মসূচির সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ওপর। শুধু উদ্বোধনী অনুষ্ঠান কিংবা নির্দিষ্ট দিনে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করলেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি স্থায়ীভাবে কমানো সম্ভব নয়। বরং নিয়মিতভাবে জমে থাকা পানি অপসারণ, আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা, বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের চলমান উদ্যোগ তাই শুধু একটি স্বাস্থ্য কর্মসূচি নয়; এর সঙ্গে নাগরিক দায়িত্ব, পরিবেশ সচেতনতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের বিষয়ও জড়িয়ে আছে। প্রধানমন্ত্রী যে সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানিয়েছেন, সেটি বাস্তবে রূপ দিতে পরিবার থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন—সব পক্ষের ধারাবাহিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের ঝুঁকিপূর্ণ সময় সামনে রেখে এখন মূল লক্ষ্য হলো ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং মানুষের মধ্যে প্রতিরোধের সংস্কৃতি তৈরি করা। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সচেতন নাগরিক এবং সমন্বিত সরকারি উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করতে পারলে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই আরও কার্যকর হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানও শেষ পর্যন্ত সেই সম্মিলিত দায়িত্ববোধের দিকেই—নিজে সুস্থ থাকা, নিজের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং সমাজকে সুস্থ রাখতে অন্যদেরও সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com