শাহরাস্তিতে রোগীর মৃত্যু, চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
শাহরাস্তিতে রোগীর মৃত্যু, চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের অবহেলায় হাজেরা বেগম (৪২) নামে এক রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার রাত ১২টার দিকে হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর স্বজনদের আহাজারি ও প্রতিবাদে হাসপাতাল এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে।

মৃত হাজেরা বেগম লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ভাটরা বাজার ইউনিয়নের জামালপুর গ্রামের শেখের বাড়ির বাসিন্দা এবং আক্তার হোসেনের স্ত্রী। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরে লিভারের জটিলতায় ভুগছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৮টার দিকে তাকে শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার রাতে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে।

রোগীর স্বামী আক্তার হোসেনের অভিযোগ, শুক্রবার রাত ১১টার দিকে তার স্ত্রীর অবস্থা গুরুতর হয়ে পড়লে তিনি কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. প্রিয়াঙ্কাকে রোগী দেখার জন্য বারবার অনুরোধ করেন। কিন্তু চিকিৎসক তাৎক্ষণিকভাবে রোগীর কাছে না এসে নিজের কক্ষে অবস্থান করছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। স্বজনদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময় চিকিৎসকের দিক থেকে রোগীকে তার কক্ষে নিয়ে আসার কথা বলা হয়।

আক্তার হোসেন জানান, গুরুতর অসুস্থ স্ত্রীকে একা তার পক্ষে কাঁধে করে চিকিৎসকের কক্ষে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো হলে রোগীকে অক্সিজেন দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। এরপর রাত ১২টার দিকে হাজেরা বেগমের মৃত্যু হয়।

প্রিয়জনকে বাঁচানোর আশায় হাসপাতালে নিয়ে আসার পর এমন মৃত্যু স্বজনদের জন্য গভীর শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রোগীর মৃত্যুর পর হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ডে কান্নাকাটি শুরু করেন পরিবারের সদস্যরা। স্বজনরা কর্তব্যরত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানান। তাদের দাবি, সংকটাপন্ন অবস্থায় রোগীকে দ্রুত পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হলে হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত।

রোগীর স্বামী আক্তার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, তার স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে লিভারের সমস্যায় ভুগছিলেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অবস্থার অবনতি হলে তিনি কর্তব্যরত চিকিৎসককে একাধিকবার রোগী দেখার অনুরোধ করেন। কিন্তু তার অভিযোগ, চিকিৎসক যথাসময়ে রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেননি। স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় তিনি দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

তবে চিকিৎসকের অবহেলার অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার কথা বলা হয়েছে। অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. প্রিয়াঙ্কার বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলে হাসপাতালের কার্ডিওলজি কনসালট্যান্ট ডা. জয়ন্ত মালাকার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি নিজেকে ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছেন বলে পরিচয় দেন। তিনি অভিযুক্ত চিকিৎসকের বক্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে নিজেই দায়িত্ব নেবেন বলে জানান।

ডা. জয়ন্ত মালাকার দাবি করেন, ওই রোগীর অবস্থা এমন ছিল যে তার আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন ছিল। লিভারের জটিল রোগের চিকিৎসা উপজেলা পর্যায়ের এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ফলে রোগীর শারীরিক অবস্থার জটিলতা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সুবিধার সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

রোগীর স্বজনদের অভিযোগের বিপরীতে চিকিৎসকের পক্ষ থেকে দেওয়া এই বক্তব্যের কারণে ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রোগীর মৃত্যুর পেছনে চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা ছিল কি না, নাকি গুরুতর শারীরিক জটিলতার কারণে তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি—তা যথাযথ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু নাছের শাকিল জানিয়েছেন, কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগটি তদন্ত করে যদি তা প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, অভিযোগের বিষয়টি কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ঘটনার খবর পেয়ে শাহরাস্তি মডেল থানা পুলিশও হাসপাতালে যায়। শাহরাস্তি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মীর মাহবুবুর রহমান জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ বিষয়ে লিখিত বা আইনগত অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

একজন রোগী যখন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হন, তখন তার পরিবার চিকিৎসকদের কাছ থেকে দ্রুত সেবা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রত্যাশা করে। বিশেষ করে সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকা রোগীর ক্ষেত্রে প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে কোনো রোগীর মৃত্যুর পর চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠলে সেটি শুধু একটি পরিবারের শোকের বিষয় নয়, একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার মান, চিকিৎসকদের দায়িত্ব এবং হাসপাতালের জরুরি ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।

শাহরাস্তির এই ঘটনাতেও মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, রোগীর শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ার পর তাকে যথাসময়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না। একই সঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গুরুতর লিভার রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও আইসিইউ সুবিধা না থাকলে তাকে দ্রুত অন্য হাসপাতালে পাঠানোর বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী সাব্যস্ত করার আগে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত জরুরি। চিকিৎসকের দায়িত্বে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, রোগীর অবস্থা কতটা গুরুতর ছিল, হাসপাতালে তখন কী ধরনের চিকিৎসা সুবিধা বিদ্যমান ছিল এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রটোকল অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় যাচাই করেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণ করা সম্ভব।

এদিকে হাজেরা বেগমের মৃত্যুতে তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শোক নেমে এসেছে। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করার পর প্রিয়জনকে হারানোর ঘটনায় স্বজনরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।

স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসকের অবহেলার কারণেই যদি হাজেরা বেগমের মৃত্যু হয়ে থাকে, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে চিকিৎসকের পক্ষ থেকে রোগীর জটিল শারীরিক অবস্থা এবং আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। তাই এখন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দুই পক্ষের বক্তব্য ও ঘটনার প্রত্যক্ষ তথ্য যাচাই করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

হাজেরা বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হলে আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বিষয়টি আরও এগিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তদন্তেও যদি দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফলে তদন্তের ফলাফলের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছেন নিহত রোগীর পরিবার এবং স্থানীয়রা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত