প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় গুলিতে নিহত শুভ চন্দ্র দাস ওরফে মো. বিল্লালের মরদেহ অবশেষে আট দিন পর দাফন করা হয়েছে। মৃত্যুর পর তাঁর ধর্মীয় পরিচয় ও শেষকৃত্য নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তৈরি হওয়া বিরোধের কারণে এতদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে পড়ে ছিল মরদেহটি। মা, স্ত্রী ও ভাই ইসলামি রীতিতে দাফনের পক্ষে থাকলেও বাবা হিন্দুধর্মীয় রীতিতে সৎকারের দাবি জানান। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আদালতের নির্দেশের পর রোববার রাতে নারায়ণগঞ্জের মাসদাইর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে জানাজা শেষে শুভর মরদেহ দাফন করা হয়।
রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে নারায়ণগঞ্জে মরদেহ নিয়ে আসেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক মফিজুল ইসলামসহ পুলিশের একটি দল। পরে মরদেহটি শুভর স্ত্রী জ্যোতি আক্তারসহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দীর্ঘ আট দিন অপেক্ষার পর প্রিয়জনের মরদেহ কাছে পেয়ে স্বজনদের মধ্যে নেমে আসে শোকের আবহ।
শুভর শেষবিদায়ে উপস্থিত ছিলেন তাঁর মা আয়েশা আক্তার, স্ত্রী জ্যোতি আক্তার, দুই বছর বয়সী মেয়ে সুমাইয়া সোহানা, ভাই ইব্রাহিম, বোনজামাই মো. সেলিমসহ পরিবারের অন্য সদস্য ও আত্মীয়স্বজন। জানাজা ও দাফনের সময় সেখানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তবে শুভর বাবা হরি চন্দ্র দাসকে সেখানে দেখা যায়নি। তাঁর মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া যায় বলে জানা গেছে।
মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের পর কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। মায়ের কান্না দেখে বাবাকে হারানো ছোট্ট সুমাইয়াও কাঁদছিল। মাত্র দুই বছর বয়সী এই শিশুর কাছে বাবাকে হারানোর গভীর অর্থ হয়তো এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু চারপাশের শোক, মায়ের কান্না আর স্বজনদের আহাজারির মধ্যে বাবাকে হারানোর এক অজানা শূন্যতা যেন তার চারপাশেও ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন পর বাবার মরদেহের শেষবিদায়ে উপস্থিত থাকা এই শিশুর দৃশ্যটি স্বজনদের শোককে আরও ভারী করে তোলে।
শুভর স্ত্রী জ্যোতি আক্তারের দাবি, তাঁর স্বামী মুসলিম পরিচয়ে জীবনযাপন করতেন এবং নিয়মিত নামাজ পড়তেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের সন্তানও মুসলিম। তিনি বলেন, স্বামীর শেষকৃত্য নিয়ে শ্বশুরের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়েছিল। উচ্চ আদালতের নির্দেশে শেষ পর্যন্ত জানাজা শেষে মুসলিম রীতিতে শুভকে দাফন করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বামী হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি।
পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুভর পারিবারিক জীবন ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভিন্ন তথ্য ও বাস্তবতা ছিল। শুভর মা পার্বতী রানী দাস ও বাবা হরি চন্দ্র দাসের সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। ২০০৩ সালে মা তাঁর তিন সন্তানকে নিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এরপর তাঁর নাম পরিবর্তন করে আয়েশা বেগম রাখা হয়। দুই ছেলের নামও পরিবর্তন করা হয়। শুভর নতুন নাম রাখা হয় মো. বিল্লাল এবং তাঁর ছোট ভাই সুজনের নাম হয় ইব্রাহিম। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে শুভ চন্দ্র দাস নামটি পরিবর্তন করা হয়নি।
পরিবারের ভাষ্য, শুভ মুসলিম পরিচয়েই বেড়ে উঠেছিলেন। প্রায় আট বছর আগে, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি জ্যোতি আক্তারকে বিয়ে করেন। কাবিননামার মাধ্যমে সম্পন্ন ওই বিয়ের পর তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় দুই বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান। শুভ ও জ্যোতি নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার ভূঁইগড় এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
কিন্তু ৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতের একটি হত্যাকাণ্ড পুরো পরিবারকে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি করে, যা মৃত্যুর পরও শেষ হয়নি। রাত সোয়া একটার দিকে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের পেছনের সড়কে শুভকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সন্ত্রাসীদের গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয় বলে মামলার তথ্য ও পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের পর স্বাভাবিক নিয়মে মরদেহ দাফনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা থাকলেও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে পরিবারের বিরোধের কারণে সেটি আর সম্ভব হয়নি।
পরিবারের তথ্যমতে, প্রথমে শুভর মরদেহ নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি অ্যাম্বুলেন্সের ফ্রিজে রাখা হয়। পরে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ালে আদালতের নির্দেশে মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে পাঠানো হয়। সেখানে আট দিন ধরে মরদেহ সংরক্ষিত ছিল। একদিকে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত, অন্যদিকে মরদেহের শেষকৃত্য নিয়ে পারিবারিক বিরোধ—দুটি বিষয় একসঙ্গে চলতে থাকে।
মরদেহ দীর্ঘদিন হিমঘরে পড়ে থাকার ঘটনায় পরিবার ও স্থানীয় মানুষের মধ্যেও নানা আলোচনা তৈরি হয়। একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর শেষ বিদায়ও যদি বিরোধের কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে সেই পরিস্থিতি স্বজনদের জন্য কতটা কঠিন হতে পারে, শুভর পরিবারের ঘটনাটি তারই একটি বেদনাদায়ক উদাহরণ। হত্যার শিকার হওয়ার পরও তাঁর মরদেহ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা পরিবারকে আরও দীর্ঘ সময় মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে রেখেছে।
এদিকে শুভ হত্যার ঘটনায় তাঁর বাবা হরি চন্দ্র দাস বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলা করেন। মামলার তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে দ্রুত কয়েকজনকে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও দিয়েছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধারের কথাও জানানো হয়েছে।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অপরাধ ও অপারেশন তারেক আল মেহেদী জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য ব্যক্তিদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পৃথক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
শুভর হত্যাকাণ্ডের পর এখন পরিবারের প্রধান প্রত্যাশা, ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা। স্বজনদের জন্য আট দিনের অপেক্ষার পর দাফন সম্পন্ন হলেও শোকের সময় শেষ হয়নি। বরং প্রিয় মানুষকে হারানোর বাস্তবতা এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দুই বছরের শিশুটির ভবিষ্যৎ, স্ত্রীর সামনে দীর্ঘ জীবন এবং মায়ের সন্তানের হারানোর বেদনা—সব মিলিয়ে পরিবারটির সামনে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিরোধের কারণে একজন নিহত মানুষের মরদেহ আট দিন হিমঘরে পড়ে থাকার ঘটনাটি একই সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক, ধর্মীয় পরিচয় এবং মৃত্যুর পর একজন মানুষের শেষ বিদায়ের অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। তবে সব বিরোধের ঊর্ধ্বে একজন মানুষের হত্যার তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের নির্দেশে শেষ পর্যন্ত শুভর দাফন সম্পন্ন হওয়ায় অন্তত তাঁর পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়েছে। এখন স্বজনদের প্রত্যাশা, হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করে দায়ীদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং ছোট্ট সুমাইয়ার বাবাকে হারানোর শোকের সঙ্গে যেন ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাটুকুও পূরণ হয়।