প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ব্যাংক খাতে মূলধন সংকট আরও গভীর হয়েছে। ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের বাড়তি চাপ এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতার কারণে চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে ২১টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা। এর আগে গত বছরের ডিসেম্বর প্রান্তিকে এসব ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি ছিল প্রায় ২ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।
তবে কয়েকটি ব্যাংকের মূলধন উদ্বৃত্ত থাকায় সামগ্রিক হিসাবের একটি অংশ সমন্বয় হয়েছে। ফলে মার্চ শেষে দেশের ৬১টি ব্যাংকের সার্বিক নিট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে এই ঘাটতি ছিল প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে তিন মাসে ব্যাংক খাতের নিট মূলধন ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংক খাতের এই পরিস্থিতি শুধু হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। মূলধন একটি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা ও ঝুঁকি মোকাবিলার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কোনো ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ত না থাকলে বড় ধরনের ঋণখেলাপি বা লোকসানের ধাক্কা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত আমানতকারী, বিনিয়োগকারী, ঋণগ্রহীতা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়তে পারে।
ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, মূলধন ঘাটতির অন্যতম প্রধান কারণ হলো খেলাপি ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি। কোনো ঋণ আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়লে ব্যাংককে সেই ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রভিশন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। খেলাপি ঋণের পরিমাণ যত বাড়ে, প্রভিশন সংরক্ষণের চাপও তত বাড়ে। এতে ব্যাংকের মুনাফা কমে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে মূলধন ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের বক্তব্যেও বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর মতে, খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতিও বাড়তে থাকে। কারণ, খেলাপি ঋণের বিপরীতে উচ্চহারে প্রভিশন রাখতে হয়। এতে মুনাফা কমে যায় এবং লোকসান হলে মূলধনের ওপর আরও চাপ তৈরি হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯৮ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে প্রভিশন ঘাটতিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পরবর্তী সময়ে জুন শেষে প্রভিশন ঘাটতি আরও বেড়ে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে নানা ধরনের দুর্বলতা, পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এবং রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের বিবেচনায় ঋণ অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে অনেক ক্ষেত্রে ঋণের যথাযথ যাচাই-বাছাই হয়নি। ঋণ দেওয়ার পর সেটি আদায়ের ক্ষেত্রেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। ফলে একসময় ভালো ঋণ হিসেবে বিতরণ করা অর্থের একটি বড় অংশ খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।
মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। এটি ব্যাংক খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩২ টাকা বর্তমানে খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই অনুপাত ব্যাংক খাতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খেলাপি ঋণের এই উচ্চ হার ব্যাংকের আয় ও তারল্য ব্যবস্থাপনাতেও চাপ তৈরি করে। ঋণ বিতরণের পর নির্ধারিত সময়ে সুদ ও আসল ফেরত না এলে ব্যাংকের প্রত্যাশিত আয় কমে যায়। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। ফলে একদিকে আয় কমে, অন্যদিকে ব্যয়ের চাপ বাড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, মূলধন ঘাটতি ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একটি ব্যাংকের দুর্বলতা অন্য ব্যাংকেও আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ২০ থেকে ২১টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি থাকা পুরো ব্যাংক খাতের দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা পরিমাপের গুরুত্বপূর্ণ সূচক ক্যাপিটাল-টু-রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও বা সিআরএআর-এর অবস্থাও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের সিআরএআর কমে ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমেছে। গত ডিসেম্বর শেষে এই হার ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫ শতাংশ সিআরএআর বজায় রাখার কথা।
অর্থাৎ নির্ধারিত মানদণ্ডের তুলনায় ব্যাংক খাতের মূলধন সক্ষমতার ব্যবধান অনেক বড় হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলোকে নতুন করে মূলধন সংগ্রহ, খেলাপি ঋণ আদায় এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল আলম খান বলেন, প্রয়োজনীয় মূলধন ও সিআরএআর বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে ব্যাংকের ওপর বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ ও আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে লভ্যাংশ ও প্রণোদনা বোনাসে নিষেধাজ্ঞা, আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়া, অর্থায়ন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং মুনাফা সংকুচিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
মার্চ শেষে সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ৬৬ হাজার ২৬৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এরপর রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, যার ঘাটতি ৩১ হাজার ৬৮৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৩০ হাজার ৫৯৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং এক্সিম ব্যাংকের ৩০ হাজার ৩০২ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
এ ছাড়া জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ১৮ হাজার ৩৫৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ১৬ হাজার ২৯৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ১১ হাজার ৯৮৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, এবি ব্যাংকের ৮ হাজার ৪৮৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি ৮ হাজার ২৩৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
ব্যাংক খাতের এই চিত্র সাধারণ মানুষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের লাখ লাখ মানুষ ব্যাংকে তাদের সঞ্চয় রাখেন, ব্যবসার জন্য ঋণ নেন এবং দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনে ব্যাংকের ওপর নির্ভর করেন। ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা তৈরি হয় না; এর সঙ্গে আমানতকারী ও ব্যবসায়ীদের আস্থা, ঋণপ্রবাহ এবং অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতার বিষয়টিও জড়িয়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক খাতকে টেকসই করতে হলে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ঋণ বিতরণে কঠোর যাচাই, প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা, কার্যকর তদারকি এবং পর্যাপ্ত মূলধন নিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের অনাদায়ী ঋণ আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ এবং যেসব ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে, সেসব বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
কারণ মূলধন ঘাটতি শুধু একটি আর্থিক সূচকের অবনতি নয়; এটি ব্যাংকের ভেতরের দুর্বলতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সমস্যা এবং ঋণ আদায়ের সক্ষমতার ওপরও প্রশ্ন তৈরি করে। সময়মতো এসব সমস্যার সমাধান করা না গেলে ভবিষ্যতে ব্যাংক খাতের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই আমানতকারীদের আস্থা রক্ষা, ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার বিষয়টি এখন দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে