২০২৯ সালের মধ্যে অভিন্ন দেওয়ানি আইন ভারতে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৮ বার
২০২৯ সালের মধ্যে অভিন্ন দেওয়ানি আইন ভারতে

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকারসহ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পৃথক আইন ও রীতি প্রচলিত রয়েছে। এবার দেশটির বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটশাসিত রাজ্যগুলোতে অভিন্ন দেওয়ানি আইন বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড (ইউসিসি) কার্যকরের উদ্যোগ আরও জোরালো করার ঘোষণা এসেছে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়েছেন, ২০২৯ সালের মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের (এনডিএ) শাসনে থাকা ২১টি রাজ্যে এই আইন কার্যকর করা হবে।

অমিত শাহের এই বক্তব্যের পর ভারতে অভিন্ন দেওয়ানি আইন নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনা আবারও জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে দেশটির মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, অভিন্ন দেওয়ানি আইন কার্যকর হলে ধর্মীয় ও পারিবারিক বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করে আসা কিছু রীতি ও অধিকার পরিবর্তিত হতে পারে। অন্যদিকে আইনটির সমর্থকদের দাবি, ধর্মের ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন পারিবারিক আইন না রেখে সবার জন্য একটি অভিন্ন কাঠামো তৈরি হলে নাগরিকদের মধ্যে আইনি সমতা আরও শক্তিশালী হবে।

রোববার অমিত শাহ বলেন, বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের কয়েকটি রাজ্যে এরই মধ্যে অভিন্ন দেওয়ানি আইন বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে এনডিএ শাসিত ২১টি রাজ্যেই এই আইন কার্যকর করার বিষয়ে তিনি আত্মবিশ্বাসী। বর্তমানে অন্তত চারটি রাজ্যে ইউসিসি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

ভারতের আইনব্যবস্থায় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়গুলো একটি দীর্ঘদিনের জটিল ও সংবেদনশীল ক্ষেত্র। দেশটির অধিকাংশ নাগরিক ফৌজদারি আইনের ক্ষেত্রে একই জাতীয় আইনের আওতায় থাকলেও বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, দত্তক, উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি বণ্টনের মতো বিষয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিজস্ব আইন ও রীতি রয়েছে। এই বহুমাত্রিক আইনব্যবস্থার পরিবর্তে সব নাগরিকের জন্য একটি অভিন্ন দেওয়ানি আইন প্রতিষ্ঠার ধারণাই ইউসিসির মূল ভিত্তি।

অভিন্ন দেওয়ানি আইন বিজেপির দীর্ঘদিনের অন্যতম রাজনৈতিক লক্ষ্য। ভারতের সংবিধানের নীতিনির্দেশনামূলক অংশেও নাগরিকদের জন্য অভিন্ন দেওয়ানি আইন প্রতিষ্ঠার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। তবে স্বাধীনতার পর থেকে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। একদিকে এর সমর্থকেরা এটিকে আইনের দৃষ্টিতে সমতা প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে বিরোধীরা মনে করেন, ভারতের মতো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে বৈচিত্র্যময় দেশে ব্যক্তিগত আইন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

মুসলিম জনগোষ্ঠীর উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো পারিবারিক বিষয়ে প্রচলিত কিছু ধর্মীয় রীতি। তাঁদের আশঙ্কা, অভিন্ন দেওয়ানি আইন কার্যকর হলে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের কিছু বিধান পরিবর্তিত বা বিলুপ্ত হতে পারে। বিশেষ করে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ এবং উত্তরাধিকারের মতো বিষয়ে নতুন আইন কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে।

অন্যদিকে ইউসিসির সমর্থকেরা বলছেন, অভিন্ন দেওয়ানি আইন ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং নাগরিক হিসেবে সবার জন্য একই অধিকার ও দায়িত্ব নিশ্চিত করতে পারে। তাঁদের মতে, একই দেশে বসবাসকারী নাগরিকদের পারিবারিক ও দেওয়ানি অধিকারের ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকার কারণে অনেক সময় নারী ও পুরুষের অধিকার নিয়ে বৈষম্য তৈরি হয়। একটি অভিন্ন আইনি কাঠামো সেই বৈষম্য কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

আইনটির সমর্থকেরা বিশেষভাবে নারীদের অধিকার প্রসঙ্গটি সামনে আনছেন। তাঁদের দাবি, অভিন্ন দেওয়ানি আইনের মাধ্যমে বহুবিবাহ বন্ধ করা, ছেলে ও মেয়ের সমান উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা এবং বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পারিবারিক বিরোধের ক্ষেত্রে দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে একটি অভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এসব পরিবর্তন বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়েই মূল বিতর্ক। ভারতের মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশে একই আইন কার্যকর করতে হলে বিভিন্ন ধর্ম, সম্প্রদায় ও অঞ্চলের সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কোনো একটি সম্প্রদায়ের কাছে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত পারিবারিক রীতি শুধু আইনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ও জড়িয়ে থাকে। ফলে ইউসিসি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনগত পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

অমিত শাহের ঘোষণায় ২০২৯ সালের মধ্যে এনডিএ শাসিত ২১টি রাজ্যে আইনটি কার্যকর করার যে লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে ভারতের পারিবারিক আইনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে প্রতিটি রাজ্যের নিজস্ব আইন, প্রশাসনিক কাঠামো এবং সামাজিক বাস্তবতা রয়েছে। তাই একটি অভিন্ন আইনি কাঠামো বাস্তবায়নে রাজ্যভেদে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে।

ভারতে ইউসিসি নিয়ে বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ধর্মীয় স্বাধীনতা। দেশটির সংবিধান নাগরিকদের ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করেছে। ফলে ব্যক্তিগত আইন পরিবর্তনের সময় ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক সমতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইউসিসির বিরোধীরা যেখানে ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা করছেন, সেখানে সমর্থকেরা বলছেন, ব্যক্তিগত আইনের নামে কোনো নাগরিকের সমান অধিকার সীমিত হওয়া উচিত নয়।

এই বিতর্কের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসছে মুসলিম নারীদের অধিকার। ইউসিসির সমর্থকেরা মনে করেন, অভিন্ন আইন হলে মুসলিম নারীরাও অন্যান্য সম্প্রদায়ের নারীদের মতো একই দেওয়ানি অধিকার পাবেন। বিশেষ করে উত্তরাধিকার ও বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সমতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে মুসলিম সংগঠন ও বিভিন্ন অধিকারকর্মীদের একটি অংশ মনে করে, সংস্কারের প্রয়োজন থাকলে তা সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা করেই করা উচিত।

অভিন্ন দেওয়ানি আইন বাস্তবায়নের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টিকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে। ফলে ২০২৯ সালের লক্ষ্য নির্ধারণের ঘোষণা ভারতের রাজনীতিতে ইউসিসিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত করতে পারে। আগামী দিনগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় সংগঠন, আইন বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের মধ্যে এ নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ভারতের জন্য বিষয়টি শুধু একটি আইন পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্র, ধর্ম, ব্যক্তিস্বাধীনতা, নারী অধিকার এবং নাগরিক সমতার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। তাই ইউসিসি কার্যকরের ক্ষেত্রে আইনটির সুনির্দিষ্ট বিধান, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ওপর এর প্রভাবই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

অমিত শাহের ঘোষিত সময়সীমা অনুযায়ী ২০২৯ সালের মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের ২১টি রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি আইন কার্যকর করা সম্ভব হলে ভারতের দেওয়ানি আইনব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন ঘটবে। তবে সেই পরিবর্তন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়, বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। একই সঙ্গে নারীর অধিকার ও নাগরিক সমতার ক্ষেত্রে আইনটি বাস্তবে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিও নজরে থাকবে।

সব মিলিয়ে, অভিন্ন দেওয়ানি আইনকে ঘিরে ভারতে নতুন করে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা আগামী কয়েক বছর দেশটির রাজনীতি ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে অভিন্ন আইনের মাধ্যমে সমতার দাবি, অন্যদিকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার উদ্বেগ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই হবে ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত