আমদানি কমিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর তাগিদ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৯ বার
আমদানি কমিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর তাগিদ

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে যেসব কৃষি ও খাদ্যপণ্য উৎপাদনের পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে, সেসব পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানি নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং খাদ্যনিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে নিজের কার্যালয় থেকে হেঁটে কৃষি মন্ত্রণালয়ে যান প্রধানমন্ত্রী। পরে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে কৃষি খাতের সার্বিক পরিস্থিতি, চলমান কার্যক্রম, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে কৃষির সম্ভাবনা, কৃষকের সমস্যা এবং খাদ্যপণ্যের আমদানি নির্ভরতা কমানোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল, টেকসই ও লাভজনক খাতে পরিণত করতে হবে। দেশের মাটি, আবহাওয়া ও কৃষকদের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে যেসব ফসল ও খাদ্যপণ্য দেশে উৎপাদন করা সম্ভব, সেগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপিত তথ্যে বৈঠকে জানানো হয়, দেশে ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরিষার উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে সরিষা উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে সরিষার উৎপাদন ছিল ৮ দশমিক ২৪ লাখ টন। পরবর্তী কয়েক বছরে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ দশমিক ৩৪ লাখ টনে পৌঁছায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৪১ লাখ টনে।

সরিষার উৎপাদন বৃদ্ধিকে কৃষি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণে দীর্ঘদিন ধরেই আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। স্থানীয় পর্যায়ে তেলবীজের উৎপাদন বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন আমদানির চাপ কমানো সম্ভব, অন্যদিকে কৃষকের জন্য নতুন আয়ের সুযোগও তৈরি হতে পারে। এ কারণে উপযোগী জমি ও অঞ্চলে তেলবীজ চাষ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বৈঠকে পেঁয়াজের উৎপাদন ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হলেও সংরক্ষণ ঘাটতি, মৌসুমি সংকট এবং বাজার ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যার কারণে বিভিন্ন সময়ে আমদানির প্রয়োজন দেখা দেয়। কৃষকের পর্যায়ে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ার-ফ্লো প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে বছরের বিভিন্ন সময়ে দেশীয় সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা চলছে।

কৃষির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বৈঠকে আলোচনায় আসে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লবণাক্ততা, খরা ও জলাবদ্ধতার কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এসব প্রতিকূলতা মোকাবিলায় লবণাক্ততা, খরা ও জলাবদ্ধতাসহিষ্ণু নতুন জাতের ফসল উদ্ভাবন ও মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কৃষকের কাছে এসব জাত দ্রুত পৌঁছে দেওয়া গেলে প্রতিকূল পরিবেশেও উৎপাদন ধরে রাখা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

কৃষি গবেষণার অগ্রগতিও বৈঠকে তুলে ধরা হয়। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের ফসলের মোট ১ হাজার ৯০টি জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। এর মধ্যে ধানের জাত রয়েছে ১৫৫টি। এসব নতুন জাতের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি রোগবালাই ও প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সময়ে এক হাজারের বেশি কৃষিপ্রযুক্তি উদ্ভাবনের তথ্যও বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় কৃষির আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কৃষিতে শ্রমিক সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে অনেক কৃষক সময়মতো জমি প্রস্তুত, রোপণ ও ফসল কাটার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন। এ পরিস্থিতিতে কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টারসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র কৃষকের কাছে সহজলভ্য ও সুলভমূল্যে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানানো হয়।

কৃষিযান্ত্রিকীকরণ শুধু উৎপাদন ব্যয় কমানোর জন্য নয়, সময়ের সঠিক ব্যবহার এবং ফসলের অপচয় কমানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ধান কাটার মৌসুমে দ্রুত ফসল ঘরে তুলতে পারলে বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির আশঙ্কা কমে। একই সঙ্গে শ্রমনির্ভর কৃষির পরিবর্তে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থা গড়ে উঠলে উৎপাদনশীলতা আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।

দেশীয় কৃষিযন্ত্র উদ্ভাবন ও উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বিদেশি যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দেশে কৃষিযন্ত্র তৈরি করা গেলে কৃষকের জন্য যন্ত্রপাতি আরও সহজলভ্য হতে পারে। পাশাপাশি কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় উদ্যোক্তা ও কারিগরি দক্ষতা তৈরির সুযোগও বাড়বে।

কৃষিতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের বিষয়েও বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বর্তমানে দেশে ২ হাজার ৬১৭টি সৌর সেচব্যবস্থা রয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর সেচব্যবস্থা আরও বাড়ানো গেলে কৃষকের সেচ খরচ কমার পাশাপাশি প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতাও কমবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি কৃষি উৎপাদনকে আরও টেকসই করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কৃষকদের সরকারি সহায়তা আরও সরাসরি ও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে কৃষক কার্ড কর্মসূচিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে এই কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর প্রথম ধাপে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কৃষককে কার্ড দেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়েছে।

কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা ও বিভিন্ন কৃষিসেবা আরও সুশৃঙ্খলভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সরকারি সহায়তা, কৃষি উপকরণ, প্রযুক্তি ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের আর্থিক সক্ষমতাও বাড়তে পারে।

বৈঠকে খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বিপণন নিয়েও আলোচনা হয়। কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্য কীভাবে কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে বাজারে পৌঁছানো যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দেওয়া হয়। কারণ উৎপাদন বাড়লেও যদি কৃষক ন্যায্য দাম না পান, তাহলে কৃষির প্রতি আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার ওপর প্রধানমন্ত্রী বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সার, বীজ, সেচ, শ্রম, পরিবহন ও যন্ত্রপাতির ব্যয় কৃষকের মোট উৎপাদন খরচে বড় ভূমিকা রাখে। এসব ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা গেলে কৃষকের লাভ বাড়বে এবং একই সঙ্গে বাজারে কৃষিপণ্যের সরবরাহও স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; কৃষি গবেষণা, উন্নত জাত, সেচ, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজার ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন। দেশে উৎপাদনযোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানি নির্ভরতা কমাতে হলে কৃষককে উৎপাদনের উপযোগী পরিবেশ দেওয়ার পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্য বিক্রির নিশ্চয়তাও তৈরি করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় তাই কৃষিকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, দেশের অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবিকার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য স্পষ্ট হয়েছে। আমদানির ওপর চাপ কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ের পাশাপাশি কৃষকের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব হবে।

কৃষি খাতে চলমান গবেষণা, নতুন জাত উদ্ভাবন, যান্ত্রিকীকরণ, সৌর সেচ, উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের কৃষি আরও উৎপাদনশীল ও আধুনিক হয়ে উঠতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের প্রকৃত সুফল নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে দ্রুত বাস্তবায়ন, কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি সরবরাহ এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারের এই সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি খাদ্য ও কৃষিপণ্যে আমদানি নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার পথ আরও সুগম হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত