হাম উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ জনের মৃত্যু

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
হাম উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ জনের মৃত্যু

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও আটজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ২৩২ জন রোগী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে ১০০ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে নিশ্চিত হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০ জন।

সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে এসব তথ্য জানানো হয়। সেখানে বলা হয়েছে, রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ২৩২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু ঢাকাতেই হামের উপসর্গ নিয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৫২৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ২৭৮ জন এবং বরিশাল বিভাগে ১৩১ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। সিলেট বিভাগে ভর্তি হয়েছেন ১৫০ জন। এছাড়া খুলনায় ৮৮ জন, ময়মনসিংহে ৫৭ জন, রাজশাহীতে ২৩ জন এবং রংপুর বিভাগে ২৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

নতুন রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তির এই পরিসংখ্যান দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে শিশু ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের মধ্যে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোকে বাড়তি প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে আক্রান্তদের সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং গুরুতর অবস্থায় পৌঁছানোর আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে সোমবার পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৫২ হাজার ১১৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ জন। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক রোগী ইতোমধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং তাদের একটি বড় অংশ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

তবে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর পাশাপাশি সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যাও উদ্বেগের মাত্রা বোঝাচ্ছে। গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার ৭২০ জনে। তাদের মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন ২০ হাজার ১২৪ জন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে হামের বিস্তার উদ্বেগের বিষয় হওয়ার অন্যতম কারণ হলো রোগটির দ্রুত সংক্রমণক্ষমতা। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে সহজেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, পরিবারের একাধিক সদস্যের একসঙ্গে বসবাস এবং শিশুদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। ফলে একটি পরিবারে একজন আক্রান্ত হলে সতর্কতা অবলম্বন না করলে অল্প সময়ের মধ্যে অন্য সদস্যদের মধ্যেও উপসর্গ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।

হামের উপসর্গ দেখা দিলে অনেক পরিবার প্রথমে বিষয়টিকে সাধারণ জ্বর, সর্দি বা ভাইরাসজনিত অসুস্থতা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। কিন্তু জ্বরের সঙ্গে শরীরে র‌্যাশ, চোখ লাল হওয়া, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া কিংবা শারীরিক দুর্বলতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে অভিভাবকদের বাড়তি সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই সঙ্গে হামের উপসর্গ নিয়ে রোগী হাসপাতালে আসছেন। ঢাকায় ৫২৪ জন নতুন রোগী ভর্তি হওয়া যেমন পরিস্থিতির ব্যাপকতা তুলে ধরছে, তেমনি চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ অন্যান্য বিভাগেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে এটি শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব রয়েছে।

সিলেট বিভাগে এক দিনে ১৫০ জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ২৭৮ জন রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপরও চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একইভাবে বরিশাল, খুলনা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুরেও রোগী ভর্তি হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একযোগে রোগীর উপস্থিতি থাকায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে, নিশ্চিত হামে মৃত্যুর পাশাপাশি হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া সব ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ যে নিশ্চিতভাবে হাম, তা ধরে নেওয়া যায় না। তাই নিশ্চিত হাম এবং সন্দেহজনক বা উপসর্গযুক্ত রোগীর তথ্য আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনেও নিশ্চিত হাম ও হামের উপসর্গের তথ্য পৃথকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৭২ হাজার ৭২০ এবং নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ২০ হাজার ১২৪—এই ব্যবধানও পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। বিপুলসংখ্যক মানুষ হামের মতো উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের অনেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তবে নতুন রোগীর সংখ্যা প্রতিদিন বাড়তে থাকলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।

হাম মোকাবিলায় চিকিৎসার পাশাপাশি জনসচেতনতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে কিছুটা দূরে রাখা, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং অসুস্থ অবস্থায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে জনসমাগমে না যাওয়ার মতো সতর্কতা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের উপসর্গের শুরু থেকেই নজর রাখা প্রয়োজন, যাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যায়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নতুন সংক্রমণ কমানো এবং গুরুতর রোগীদের সময়মতো চিকিৎসার আওতায় আনা। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি মাঠপর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ ও নজরদারিও জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ কোনো এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে সংক্রমণের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনার সুযোগ তৈরি হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিদিনের তথ্য পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নতুন রোগী, হাসপাতালে ভর্তি, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা এবং মৃত্যুর সংখ্যা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করলে কোন অঞ্চলে সংক্রমণের চাপ বেশি এবং কোথায় অতিরিক্ত স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।

এদিকে এক দিনে আরও আটজনের মৃত্যুর খবর সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারে শিশু রয়েছে, তাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়তে পারে। তবে আতঙ্কের পরিবর্তে সচেতনতা, উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলাই পরিস্থিতি মোকাবিলার কার্যকর পথ।

দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান তাই নতুন করে সতর্ক হওয়ার বার্তা দিচ্ছে। একদিকে বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন, অন্যদিকে প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এই দ্বৈত পরিস্থিতিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৫২ হাজার ১১৭ জন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ জন চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। তবে একই সময়ের মধ্যে নিশ্চিত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ৩০ জনের মৃত্যুর তথ্য সামনে এসেছে। ফলে পরিস্থিতিকে হালকাভাবে না দেখে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও কার্যকর সচেতনতা তৈরি করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত