ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে দেলাওয়ার, বিএনপির সিদ্ধান্ত শুক্রবার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে দেলাওয়ার, বিএনপির সিদ্ধান্ত শুক্রবার

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছেড়ে দেওয়া ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচনের প্রস্তুতি ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে। আগামী ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর দেলাওয়ার হোসেনের প্রার্থিতা চূড়ান্ত হয়েছে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে কে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। দলটির মনোনয়ন বোর্ডের সভায় আগামী শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি ঠাকুরগাঁও সদর, রুহিয়া ও ভূল্লী এলাকা নিয়ে গঠিত। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেন। সেই নির্বাচনে ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪১ হাজার ১৭ ভোট। দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল ৯৭ হাজার ৮১৯। কয়েক মাসের ব্যবধানেই একই আসনে আবারও ভোটের মাঠে ফিরছেন দেলাওয়ার। এবার তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কে হবেন, সেটিই স্থানীয় রাজনৈতিক আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সংসদীয় আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। এরপর নির্বাচন কমিশন উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। ২৯ সেপ্টেম্বর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ৭ অক্টোবর এবং ৮ অক্টোবর প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। সবশেষে ২৯ অক্টোবর ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

জামায়াতে ইসলামী ইতিমধ্যে দেলাওয়ার হোসেনকে প্রার্থী হিসেবে সামনে এনেছে। গত ৩০ আগস্ট দলটির পক্ষ থেকে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়। তিনি জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য এবং ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি। এর আগে তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই দেলাওয়ার হোসেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনের বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর নির্বাচনী কার্যক্রমে দলের নারী কর্মীরাও অংশ নিচ্ছেন। ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনা এবং নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার মাধ্যমে তিনি নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন।

দেলাওয়ার হোসেনের বক্তব্যে এবারের নির্বাচনে বিএনপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থানকে গুরুত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে। তিনি দাবি করেছেন, দেশের মানুষ যে প্রত্যাশা নিয়ে বিএনপিকে ভোট দিয়েছিল, সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও তিনি সমালোচনা করেছেন। তাঁর ধারণা, এ কারণে ভোটারদের একটি অংশ বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে এবং উপনির্বাচনে তাঁর জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সিদ্ধান্তই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে।

অন্যদিকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। দলটির একাধিক নেতা এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন। তিনি প্রয়াত? নয়, রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছোট ভাই এবং স্থানীয় বিএনপিতে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক অবস্থানে রয়েছেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁর মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

মির্জা ফয়সল আমিন নিজেও মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী। তাঁর ভাষ্য, দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। বিএনপির মতো বড় একটি রাজনৈতিক দলে একই আসনে একাধিক নেতা মনোনয়ন চাইতেই পারেন বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন বোর্ডই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকায় আরও রয়েছেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান সুলতানুল ফেরদৌস নম্র চৌধুরী এবং জেলা বিএনপির আরেক সহসভাপতি ওবায়দুল্লাহ মাসুদ। ফলে বিএনপির ভেতরে মনোনয়ন নিয়ে প্রতিযোগিতা যেমন রয়েছে, তেমনি চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাইকে কেন্দ্র করে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

সুলতানুল ফেরদৌসের রাজনৈতিক পথচলাও দীর্ঘ। একসময় তিনি জাতীয় পার্টির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০১৪ সালে জাতীয় পার্টি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন। এবারের উপনির্বাচনে তিনি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দল যাঁকে শেষ পর্যন্ত প্রার্থী হিসেবে বেছে নেবে, তাঁর পক্ষেই মাঠে কাজ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশী ওবায়দুল্লাহ মাসুদ ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে উঠে এসেছেন। তিনি ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের জিএস ও ভিপি ছিলেন। তাঁর মতে, ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে উঠে আসা কোনো নেতাকে দল মনোনয়ন দিলে বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে আস্থা আরও বাড়তে পারে। তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি ও ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতাও মনোনয়ন প্রত্যাশার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তিনি তুলে ধরছেন।

বিএনপির প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার আগেই দলটির ভেতরে মনোনয়ন নিয়ে একাধিক মত ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী জানিয়েছেন, একাধিক নেতা মনোনয়ন চাইতেই পারেন। তবে দলীয় নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশ দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামে দলের পাশে থাকা নেতাকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান। তাঁর মতে, ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপির উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোটারদের সমর্থন থাকবে।

তবে বিএনপির অভ্যন্তরীণ মনোনয়ন প্রতিযোগিতার পাশাপাশি এবার নির্বাচনী মাঠে স্বতন্ত্র প্রার্থিতার সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। জেলা বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক এবং বিএনপি-সমর্থিত বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সত্যজিৎ কুমার কুন্ডু ইতিমধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, দল তাঁকে বহিষ্কার করলেও নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা তাঁর নেই। ফলে বিএনপির প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর তাঁর অবস্থানও নির্বাচনী সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

এ ছাড়া কনটেন্ট ক্রিয়েটর আশরাফুল আলম, যিনি হিরো আলম নামে পরিচিত, তিনিও এই উপনির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন—এমন আলোচনা স্থানীয়ভাবে রয়েছে। তবে তাঁর প্রার্থিতা সম্পর্কে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের এই উপনির্বাচন তাই শুধু একটি শূন্য আসন পূরণের ভোট হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং স্থানীয় রাজনীতিতে দলগুলোর জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক শক্তি এবং ভোটারদের মনোভাব যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। গত জাতীয় নির্বাচনে যে দুই প্রার্থী প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে এবার একজন সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও অন্যজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মাঠের সমীকরণ বদলে গেছে। ফলে আগের নির্বাচনের ফলাফল এবার হুবহু পুনরাবৃত্তি হবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেন ইতিমধ্যে প্রচারণা শুরু করায় নির্বাচনী মাঠে তাঁর উপস্থিতি স্পষ্ট। বিপরীতে বিএনপির প্রার্থী কে হচ্ছেন, সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা। আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর মনোনয়ন বোর্ডের সিদ্ধান্তের পরই ঠাকুরগাঁও-১ আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র আরও পরিষ্কার হবে। এরপর মনোনয়ন জমা, যাচাই-বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার ও প্রতীক বরাদ্দের ধাপ পেরিয়ে ২৯ অক্টোবর ভোটাররা তাঁদের সিদ্ধান্ত জানাবেন।

সব মিলিয়ে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন ঘিরে এরই মধ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে শুরু করেছে। জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেনের আগাম মাঠে নামা, বিএনপির একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশীর প্রতিযোগিতা এবং সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উপস্থিতি ভোটের মাঠকে বহুমাত্রিক করে তুলছে। শেষ পর্যন্ত বিএনপির মনোনয়ন কার হাতে যায় এবং ভোটাররা কোন রাজনৈতিক বার্তা দেন, সেটিই এখন এই আসনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত