প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতির প্রভাব এবার বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিচালনা পর্ষদেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোম্পানিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়াতে সম্মত হয়েছেন। তাঁর পদত্যাগের পর কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ নতুন কাঠামোয় পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) জানিয়েছে বেক্সিমকো ফার্মা।
কোম্পানির পক্ষ থেকে বিএসইসিকে দেওয়া চিঠিতে জানানো হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সালমান এফ রহমান নিজেই পর্ষদ থেকে সরে যাওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন। তাঁর সংশ্লিষ্টতার কারণে কোম্পানির ব্যবসা কিংবা শেয়ারধারীদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়—এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিএসইসিও প্রস্তাবিত নতুন পরিচালনা কাঠামোর বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে বলে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত নতুন পর্ষদে উদ্যোক্তাদের মধ্য থেকে তিনজন পরিচালক রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর সঙ্গে চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক, আইএফআইসি ব্যাংকের পক্ষ থেকে মনোনীত একজন পরিচালক এবং পদাধিকারবলে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নিয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের উদ্যোগ চলছে। অর্থাৎ সালমান এফ রহমানের সরে দাঁড়ানোর পর কোম্পানির পরিচালনা কাঠামোয় স্বতন্ত্র পরিচালকের ভূমিকা আগের তুলনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বেক্সিমকো ফার্মার এই পরিবর্তনের পেছনে মূলত দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং এর ফলে কোম্পানিটির ব্যবসায় তৈরি হওয়া প্রতিকূলতার বিষয়টি সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সালমান এফ রহমান গ্রেপ্তার হন। তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে তাঁর সঙ্গে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সংশ্লিষ্টতা বেক্সিমকো ফার্মার ব্যবসা ও ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলছে—এমন বিষয় বিবেচনায় নিয়েই পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে কোম্পানির চিঠিতে বলা হয়েছে।
বেক্সিমকো ফার্মার জন্য বিষয়টি কেবল একটি পরিচালনা পরিবর্তনের ঘটনা নয়। দেশের অন্যতম পরিচিত ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কোম্পানিটির ব্যবসা, বিনিয়োগকারী আস্থা এবং আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে অবস্থানের সঙ্গেও এই সিদ্ধান্তের সম্পর্ক রয়েছে। কোম্পানিটি বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পাশাপাশি লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেট বা এআইএমেও তালিকাভুক্ত। ফলে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে স্থানীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তালিকাভুক্তির নিয়মকানুনও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
কোম্পানির পক্ষ থেকে বিএসইসিকে জানানো হয়েছে, নতুন পরিচালক নিয়োগের আগে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী যথাযথ যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য পরিচালকদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই ও মূল্যায়ন করা হবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে আনুমানিক চার থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পর্ষদ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিএসইসি চেয়েছিল নতুন পরিচালনা পর্ষদে বিদেশি শেয়ারধারীদের প্রতিনিধিত্ব রাখা হোক। তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এ ধরনের প্রতিনিধিত্বে সম্মতি দেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে বিদেশি প্রতিনিধিকে সরাসরি পর্ষদে যুক্ত না করে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানোর মাধ্যমে পরিচালনা কাঠামো সাজানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বিষয়টি শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের কাছেও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বেক্সিমকো ফার্মার মালিকানা কাঠামোতে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক, বিদেশি ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বড় অংশীদারত্ব রয়েছে। ফলে পরিচালনা পর্ষদের যেকোনো বড় পরিবর্তনের সঙ্গে কোম্পানির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা, ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার বিষয়টি সরাসরি জড়িত।
শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বেক্সিমকো ফার্মা দেশের ওষুধ খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানি। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সালমান এফ রহমানের মালিকানা ও প্রভাব কোম্পানিটির ব্যবসা ও সুনামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে তাঁরা মনে করেন। তাঁদের মতে, পরিচালনা পর্ষদ থেকে তাঁর সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত কোম্পানিটির জন্য নতুনভাবে ব্যবসায়িক আস্থা তৈরির সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু একজন পরিচালকের পরিবর্তনেই একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সংকট পুরোপুরি কেটে যায় না। ব্যবসার ধারাবাহিকতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সুশাসন, ঋণ ও দায় ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক তালিকাভুক্তির শর্ত পূরণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন—সবকিছুর ওপরই কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। ফলে নতুন পর্ষদ গঠনের পর তারা কীভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বেক্সিমকো ফার্মার আর্থিক সক্ষমতাও এই পরিবর্তনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। কোম্পানিটির সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ প্রান্তিকে কোম্পানিটি ২২২ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে, গত বছরের জুনে সমাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, কোম্পানিটির মুনাফা ছিল ৬৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ রাজনৈতিক ও পরিচালনাগত নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও কোম্পানিটি উল্লেখযোগ্য মুনাফা ধরে রেখেছে।
১৯৮৬ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া বেক্সিমকো ফার্মার উদ্যোক্তাদের হাতে কোম্পানিটির প্রায় ৩০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। উদ্যোক্তাদের মধ্যে সালমান এফ রহমানও একজন। বাকি বড় অংশের শেয়ার রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক, বিদেশি ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে। ফলে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনের পাশাপাশি কোম্পানির মালিকানা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করাও নতুন ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সালমান এফ রহমান দীর্ঘদিন ধরে বেক্সিমকো গ্রুপের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এবং দেশের ব্যবসা ও শিল্প খাতের পরিচিত ব্যক্তিত্ব। রাজনৈতিক জীবনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে তিনি সরকারের ব্যবসা, বিনিয়োগ ও শিল্পসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর গ্রেপ্তার এবং পরবর্তী আইনি পরিস্থিতি বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপরও প্রভাব ফেলেছে।
বেক্সিমকো ফার্মার পর্ষদ পুনর্গঠন তাই বৃহত্তর বেক্সিমকো গ্রুপের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে কোম্পানিটির অবস্থান ধরে রাখা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের এআইএমে তালিকাভুক্ত থাকার কারণে কোম্পানিকে নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং তালিকাভুক্তির অন্যান্য শর্তও যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বেক্সিমকো ফার্মার আন্তর্জাতিক তালিকাভুক্তি নিয়েও চাপ তৈরি হয়েছিল। আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণে জটিলতার কারণে লন্ডন বাজারে কোম্পানিটির অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ফলে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের সময় শুধু স্থানীয় ব্যবসায়িক বাস্তবতা নয়, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা এবং বিদেশি বাজারের নিয়মকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
এ অবস্থায় সালমান এফ রহমানের পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে কোম্পানির জন্য একটি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা এবং উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে নতুন ভারসাম্য তৈরির উদ্যোগ কোম্পানিটির করপোরেট সুশাসন জোরদারে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সব মিলিয়ে বেক্সিমকো ফার্মার সামনে এখন দুটি সমান্তরাল লক্ষ্য—একদিকে ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রম ও মুনাফার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তৈরি হওয়া ভাবমূর্তি ও বিনিয়োগকারী আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠা। সালমান এফ রহমানের পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়ানো সেই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। নতুন পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর কোম্পানির ব্যবসা ও সুশাসনে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে দেশের অন্যতম বড় ওষুধ কোম্পানিটির পরবর্তী পথচলা।