মদিনায় মিলল বিরল খনিজ ও ইউরেনিয়ামের বড় ভান্ডার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
মদিনায় মিলল বিরল খনিজ ও ইউরেনিয়ামের বড় ভান্ডার

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সৌদি আরবের মদিনা অঞ্চলে বিরল মৃত্তিকা খনিজ ও ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ আনুমানিক ১১ কোটি টন আকরিকের সন্ধান পাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। মদিনা অঞ্চলের জাবাল সাঈদ এলাকায় পরিচালিত ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও অনুসন্ধানের পর এই সম্পদের সন্ধান পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আব্দুলআজিজ বিন সালমান। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ৭০তম সাধারণ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ তথ্য প্রকাশ করেন।

সৌদি মন্ত্রীর ঘোষণায় বলা হয়েছে, জাবাল সাঈদ প্রকল্পে শনাক্ত হওয়া আকরিকের মধ্যে বিশেষ করে ভারী ধরনের বিরল মৃত্তিকা উপাদানের ঘনত্ব উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি সেখানে ইউরেনিয়ামেরও আশাব্যঞ্জক ঘনত্ব পাওয়া গেছে। তবে ১১ কোটি টন হলো মোট শনাক্ত আকরিকের আনুমানিক পরিমাণ; এর পুরোটাই ইউরেনিয়াম নয়। ইউরেনিয়ামের নির্দিষ্ট পরিমাণ এবং বাণিজ্যিকভাবে কতটুকু উত্তোলনযোগ্য হবে, সে বিষয়ে আরও মূল্যায়ন প্রয়োজন রয়েছে।

এই আবিষ্কারকে সৌদি আরবের খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ও জ্বালানি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে তেলনির্ভর অর্থনীতির বাইরে নতুন শিল্প ও আয়ের উৎস তৈরির চেষ্টা করছে দেশটি। ‘ভিশন ২০৩০’-এর আওতায় খনিজ, শিল্প, প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতকে আরও বৈচিত্র্যময় করার যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, নতুন এই আবিষ্কার সেই উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাবাল সাঈদ এলাকায় পরিচালিত অনুসন্ধানে বিরল মৃত্তিকা খনিজের উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্প উৎপাদনে এসব খনিজের ব্যবহার রয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, ব্যাটারি, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন উচ্চপ্রযুক্তির শিল্পে বিরল মৃত্তিকা উপাদানের চাহিদা রয়েছে। ফলে এসব খনিজের বড় মজুত কোনো দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বাড়াতে পারে।

বিশ্বজুড়ে বর্তমানে বিরল মৃত্তিকা খনিজের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে এসব খনিজের চাহিদাও বাড়ছে। একই সঙ্গে কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর বৈশ্বিক সরবরাহের বড় অংশ নির্ভরশীল হওয়ায় নতুন উৎস খুঁজে বের করা বিভিন্ন দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় সৌদি আরবের জাবাল সাঈদে বড় আকরিকের সন্ধান দেশটির জন্য অর্থনৈতিক সুযোগের পাশাপাশি কৌশলগত গুরুত্বও তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে ইউরেনিয়ামের উপস্থিতি সৌদি আরবের জ্বালানি পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের জন্য পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার কথা বলে আসছে। সৌদি সরকারের পরিকল্পনায় ভবিষ্যতের জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থায় পারমাণবিক শক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি রয়েছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশের নিজস্ব ইউরেনিয়াম সম্পদ চিহ্নিত করা এবং অর্থনৈতিকভাবে এর ব্যবহারযোগ্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগও চলছে।

আইএইএর সম্মেলনে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী জানিয়েছেন, জাতীয় পারমাণবিক জ্বালানি প্রকল্পের আওতায় ইউরেনিয়াম সম্পদ অনুসন্ধান ও সেগুলোর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা মূল্যায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। জাবাল সাঈদের আবিষ্কার সেই বৃহত্তর অনুসন্ধান কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হিসেবে সামনে এসেছে।

সৌদি আরব শুধু ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম আকরিক উত্তোলনের সম্ভাবনাই দেখছে না; দেশটির ফসফেট সার উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত উপাদান থেকেও ইউরেনিয়াম আহরণের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলে ফসফেটভিত্তিক সার উৎপাদনের সময় ফসফরিক অ্যাসিডের সঙ্গে থাকা ইউরেনিয়াম আলাদা করার বিষয়ে পরীক্ষামূলক কাজও হয়েছে। ফরাসি পারমাণবিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ওরানোর সঙ্গে এ ধরনের সহযোগিতার কথাও সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে জাবাল সাঈদের নতুন আবিষ্কারকে শুধু একটি খনিজ আবিষ্কার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সৌদি আরবের খনিজ সম্পদকে শিল্পে রূপান্তর এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা তৈরির বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত। দেশটি কাঁচামাল উত্তোলনের পাশাপাশি সেগুলোর প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিশোধন এবং মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ খনিজ শিল্প গড়ে তুলতে চায়।

সৌদি আরবের এই উদ্যোগে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি খনিজ ও বিরল মৃত্তিকা খাতেও মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সৌদি সহযোগিতা বাড়ছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ২০২৫ সালের যুক্তরাষ্ট্র সফরের পর দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ খাতে সহযোগিতা আরও জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সৌদি রাষ্ট্রীয় খনি প্রতিষ্ঠান মাআদেন এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এমপি ম্যাটেরিয়ালসের মধ্যেও বিরল মৃত্তিকা খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে অংশীদারত্বের উদ্যোগ রয়েছে।

এর আগে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন সমঝোতায় পৌঁছায়। ফলে মদিনায় ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ আকরিকের সন্ধানের ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন সৌদি আরব পারমাণবিক শক্তিকে তার ভবিষ্যৎ জ্বালানি ব্যবস্থার অংশ করার প্রস্তুতি আরও জোরদার করছে। তবে এই সম্পদ কীভাবে উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাত ও ব্যবহার করা হবে, তা নির্ধারণে অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

সৌদি কর্তৃপক্ষ একই সঙ্গে জোর দিয়ে বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও তদারকির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে নেওয়া হবে। আইএইএর সঙ্গে সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় কাজ করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে ইউরেনিয়ামের নতুন সম্পদ আবিষ্কারের পাশাপাশি এর ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।

মদিনার জাবাল সাঈদ অঞ্চলের খনিজ সম্পদ সৌদি আরবের অর্থনীতির জন্য কতটা বড় পরিবর্তন আনতে পারবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কারণ কোনো ভূতাত্ত্বিক সম্পদের পরিমাণ বড় হলেই তা সম্পূর্ণ বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য হয়ে যায় না। আকরিকের গুণমান, খনিজের প্রকৃত ঘনত্ব, উত্তোলন ব্যয়, প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সংশ্লিষ্ট খনিজের মূল্য—সবকিছু বিবেচনা করেই চূড়ান্ত অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নির্ধারণ করতে হয়।

তবে নতুন এই আবিষ্কার সৌদি আরবের সামনে সম্ভাবনার একটি বড় দরজা খুলে দিয়েছে। তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি বিরল মৃত্তিকা খনিজ, ইউরেনিয়াম এবং অন্যান্য কৌশলগত খনিজকে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অংশ করার যে চেষ্টা দেশটি চালাচ্ছে, জাবাল সাঈদের সম্পদ সেই প্রচেষ্টাকে নতুন গতি দিতে পারে।

বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তর এবং উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের দ্রুত বিস্তারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। সৌদি আরব যদি নিজস্ব সম্পদকে আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব ও দক্ষ প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে খনিজ খাত দেশটির অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচিতে দেশীয় সম্পদের সম্ভাব্য ব্যবহার সৌদির দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

সব মিলিয়ে মদিনার জাবাল সাঈদে বিপুল পরিমাণ আকরিকের সন্ধান সৌদি আরবের জন্য একই সঙ্গে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও জ্বালানি সম্ভাবনার নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। এখন মূল নজর থাকবে বিস্তারিত অনুসন্ধান, সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ ও মান নির্ধারণ এবং এসব সম্পদ বাণিজ্যিকভাবে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেই পরিকল্পনার ওপর। সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে সৌদি আরবকে শুধু তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে আরও বহুমুখী খনিজ ও জ্বালানি অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত