দেশজুড়ে ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্কের উদ্যোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
দেশজুড়ে ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্কের উদ্যোগ

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মানুষের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা ২৪টি ট্রমা সেন্টারকে আধুনিকায়ন করে ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ হিসেবে চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম, অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করে পর্যায়ক্রমে এসব কেন্দ্রে জরুরি চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর হাসপাতালে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়া কিংবা দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকা অনেক সময় আহত ব্যক্তির অবস্থাকে আরও সংকটাপন্ন করে তোলে। বিশেষ করে মাথা, বুক, মেরুদণ্ড ও হাড়ে গুরুতর আঘাত পাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে মহাসড়ককেন্দ্রিক জরুরি চিকিৎসা অবকাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে।

গত ১২ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক বৈঠকে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা ট্রমা সেন্টারগুলো চালুর বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে বিদ্যমান ২৪টি ট্রমা সেন্টারের নাম পরিবর্তন করে ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে মহাসড়কের পাশে খালি জায়গায় প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়েও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় এক্স-রে মেশিন, অ্যাম্বুলেন্স এবং অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে। এ জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অনুমোদিত বাজেট থেকে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। ফলে শুধু ভবন চালু করাই নয়, জরুরি চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে বিভিন্ন সময়ে এসব ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছিল দুর্ঘটনায় আহত মানুষকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনার উদ্দেশ্যে। স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ১০টি এবং ২০১০ সালে আরও ১৪টি ট্রমা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু নির্মাণের পর প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রশাসনিক অনুমোদনের ঘাটতির কারণে অধিকাংশ কেন্দ্র নিয়মিতভাবে কার্যকর হয়নি। বর্তমানে মাত্র দুটি কেন্দ্রে সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগীয় সেবা চালু থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

এ অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা এসব ভবনকে নতুনভাবে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত রোগীদের দ্রুত প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা দেওয়া। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিনতলা ভবনে ২০ শয্যার আইসিইউ এবং ৪০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। তবে বাস্তবে সব কেন্দ্রে সেই কাঠামো অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা চালু করা সম্ভব হয়নি।

সিরাজগঞ্জ সদরের মুলিবাড়ী ট্রমা সেন্টার এ পরিস্থিতির একটি উদাহরণ। ঢাকা-রাজশাহী-রংপুর মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২০ সালে কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় এটি অব্যবহৃত থাকার পর চলতি বছরের কোরবানির ঈদের সময় দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দিতে ২১ মে থেকে ১৪ দিনের জন্য অস্থায়ীভাবে চালু করা হয়েছিল। পরে আবার কেন্দ্রটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত এসব কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে পাবনার আটঘরিয়া, বগুড়ার শেরপুর, সিরাজগঞ্জ সদর ও উল্লাপাড়া, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, গোপালগঞ্জ সদর, মাদারীপুরের শিবচর, মানিকগঞ্জের শিবালয়, শরীয়তপুরের জাজিরা, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর, ঢাকার ধামরাই, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, হাটহাজারী ও রাউজান, কুমিল্লার দাউদকান্দি, ময়মনসিংহের ভালুকা, সুনামগঞ্জের ছাতক এবং হবিগঞ্জের বাহুবলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কসংলগ্ন এলাকা।

তবে শুধু ভবন ও চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেই জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা কার্যকর হয় না। প্রয়োজন দক্ষ চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, প্রশিক্ষিত জরুরি সেবাকর্মী এবং দ্রুত রোগী পরিবহনের ব্যবস্থা। পুরোনো পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি ট্রমা সেন্টারে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞসহ ১৪ জন চিকিৎসক এবং ১০ জন নার্স থাকার কথা ছিল। পাশাপাশি ফার্মাসিস্ট, রেডিওগ্রাফার ও অন্যান্য টেকনিশিয়ানেরও প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কোনো কেন্দ্রেই প্রস্তাবিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে।

নতুন উদ্যোগে তাই অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ককে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত জানিয়েছেন, মহাসড়ককে কেন্দ্র করে ২৪টি ট্রমা সেন্টার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজ চলছে। লক্ষ্য হলো দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে দ্রুত উদ্ধার করে জরুরি চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসা।

সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক মিনিট অনেক সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ কারণে দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকা প্রশিক্ষিত ব্যক্তি যদি প্রাথমিক সহায়তা দিতে পারেন এবং দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে পারে, তাহলে আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার আগের সময়টিও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব। বাংলাদেশে কমিউনিটি ফার্স্ট-রেসপন্ডার নিয়ে পরিচালিত একটি পাইলট উদ্যোগে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের পাঁচ থেকে আট মিনিটের মধ্যে প্রাথমিক সহায়তা দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এই অভিজ্ঞতা দেশব্যাপী জরুরি সেবা ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে মহাসড়কে দুর্ঘটনার পর উদ্ধার ও চিকিৎসার মধ্যবর্তী সময় কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর রাখতে প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতা, অ্যাম্বুলেন্সের রক্ষণাবেক্ষণ, যোগাযোগব্যবস্থা, জরুরি কল গ্রহণ, রোগী কোথায় পাঠানো হবে সে বিষয়ে সমন্বয় এবং দায়িত্বশীল জনবল নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এ উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মহাসড়ক ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়। দুর্ঘটনার পর রোগীকে শুধু দ্রুত পরিবহন করলেই হবে না; কোন হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে, কোথায় জরুরি অস্ত্রোপচার বা বিশেষায়িত চিকিৎসা পাওয়া যাবে—এসব তথ্যও দ্রুত জানা দরকার। নতুন ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’গুলো কার্যকর হলে স্থানীয় পর্যায়ে জরুরি চিকিৎসার একটি মধ্যবর্তী স্তর তৈরি হতে পারে, যা গুরুতর রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর আগ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকা সরকারি স্বাস্থ্য অবকাঠামোকে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলার এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রশাসনিক সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। অতীতে কেন্দ্র নির্মাণের পরও জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে সেবা চালু না হওয়ার যে অভিজ্ঞতা রয়েছে, এবার সেই সমস্যাগুলো এড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ। ভবন চালু করার পাশাপাশি চিকিৎসক-নার্স নিয়োগ, জরুরি সরঞ্জাম, অ্যাম্বুলেন্স, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সহায়ক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন অ্যাম্বুলেন্স ও স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ককে ভবিষ্যতে নিয়মিত স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি টেকসই অংশ হিসেবে পরিচালনার লক্ষ্য রয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসাসেবার কাঠামো আরও সংগঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা ট্রমা সেন্টারগুলোও মানুষের বাস্তব প্রয়োজনে ব্যবহারের সুযোগ পাবে।

সড়কে দুর্ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হলেও দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা ও যথাযথ হাসপাতালে স্থানান্তরের মাধ্যমে প্রাণহানি কমানোর সুযোগ থাকে। সেই জায়গা থেকেই ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক এবং ২৪টি ট্রমা সেন্টারকে নতুন কাঠামোয় চালুর উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে। এখন এর সফলতা নির্ভর করবে পরিকল্পনাগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং দীর্ঘদিনের জনবল, সরঞ্জাম ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতিগুলো কতটা কার্যকরভাবে দূর করা যায় তার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত