প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের রাজধানী চেন্নাইয়ে একটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কফি চেইন স্টারবাকস। এ বিষয়ে তামিলনাড়ু রাজ্য সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। নতুন এই প্রযুক্তি কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে চেন্নাইয়ে প্রযুক্তি খাতে প্রায় ৮০০টি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছে রাজ্য সরকার।
সোমবার তামিলনাড়ু সরকারের পক্ষ থেকে স্টারবাকসের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি জানানো হয়। বিশ্বের অন্যতম পরিচিত কফি ব্র্যান্ড হিসেবে স্টারবাকসের ভারতে বড় ব্যবসায়িক উপস্থিতি রয়েছে। দেশটিতে প্রতিষ্ঠানটির ক্যাফের সংখ্যা প্রায় ৫০০। ফলে চেন্নাইয়ে নতুন প্রযুক্তি কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগকে ভারতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্টারবাকসের প্রযুক্তি কেন্দ্রটি ঠিক কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের বৈশ্বিক প্রযুক্তি কেন্দ্র সাধারণত সফটওয়্যার উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, ব্যবসায়িক বিশ্লেষণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং গবেষণা ও উন্নয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখে। ফলে চেন্নাইয়ে কেন্দ্রটি চালু হলে এটি শুধু ভারতের বাজারকে সহায়তা করবে, নাকি স্টারবাকসের বৈশ্বিক ব্যবসার বিভিন্ন অংশও এখান থেকে পরিচালিত হবে, সেটি ভবিষ্যতে স্পষ্ট হতে পারে।
তামিলনাড়ু সরকারের সঙ্গে স্টারবাকসের চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো কর্মসংস্থান। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৮০০টি প্রযুক্তি খাতের চাকরি তৈরির সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে দক্ষ জনবলের চাহিদা বাড়ার সময়ে এ ধরনের বিনিয়োগ স্থানীয় তরুণ ও প্রযুক্তিপেশাজীবীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সফটওয়্যার, ডেটা, প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসায়িক সেবা খাতে দক্ষ কর্মীদের জন্য চেন্নাইয়ের কর্মসংস্থানের বাজার আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চেন্নাই ইতোমধ্যে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক কেন্দ্রগুলোর একটি। শহরটিতে বিশ্বের বিভিন্ন বড় আর্থিক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম রয়েছে। সিটি, বার্কলেস এবং আমেরিকান এক্সপ্রেসের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি কেন্দ্রও সেখানে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রগুলো বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সহায়তা দিয়ে থাকে।
আন্তর্জাতিক ব্যবসায় বৈশ্বিক প্রযুক্তি কেন্দ্রের গুরুত্ব গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একসময় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এসব কেন্দ্রকে মূলত কম খরচে দাপ্তরিক বা সহায়ক কাজ পরিচালনার জায়গা হিসেবে বিবেচনা করত। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ডিজিটাল রূপান্তরের ফলে সেই ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান তাদের গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার, ডেটা, অর্থ ব্যবস্থাপনা, গবেষণা এবং ব্যবসায়িক বিশ্লেষণের কাজও এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে পরিচালনা করছে।
এই পরিবর্তনের ফলে ভারতের বিভিন্ন শহর বৈশ্বিক প্রযুক্তি কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে। দক্ষ প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবসায়িক সেবা পেশাজীবীদের বড় একটি কর্মীবাজার দেশটিতে তৈরি হয়েছে। তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক পরিচালন ব্যয়ের পাশাপাশি দক্ষ জনবল পাওয়ার সুযোগও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভারতে প্রযুক্তি কার্যক্রম সম্প্রসারণে উৎসাহিত করছে।
স্টারবাকসের চেন্নাইয়ের উদ্যোগ সেই বৃহত্তর প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কফি ও খাদ্যসেবা খাতের প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্টারবাকসের মূল পরিচিতি থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক ব্যবসা পরিচালনায় প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গ্রাহকসেবা, মোবাইল অ্যাপ, ডিজিটাল পেমেন্ট, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, দোকান পরিচালনা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ভূমিকা রয়েছে। একটি বড় প্রযুক্তি কেন্দ্র এসব কার্যক্রমকে আরও সমন্বিত ও দক্ষভাবে পরিচালনার সুযোগ দিতে পারে।
ভারতে স্টারবাকসের ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে টাটা কনজ্যুমার প্রোডাক্টসের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে। দেশটির বিভিন্ন শহরে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৫০০টি ক্যাফে রয়েছে। ভারতীয় বাজারে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি তৈরির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
তবে নতুন প্রযুক্তি কেন্দ্রটি স্টারবাকসের ভারতীয় ব্যবসার জন্য কতটা কাজ করবে এবং এর কতটা অংশ বৈশ্বিক কার্যক্রমে যুক্ত হবে, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে স্টারবাকসের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
চেন্নাইয়ের জন্য স্টারবাকসের এই বিনিয়োগের গুরুত্ব শুধু নতুন কর্মসংস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কোনো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান একটি শহরে প্রযুক্তি কেন্দ্র স্থাপন করলে এর সঙ্গে স্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ সংস্থা, পেশাজীবী এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক সেবার চাহিদাও বাড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এমন বিনিয়োগ একটি শহরের প্রযুক্তি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
স্টারবাকসের চুক্তির মাত্র কয়েক দিন আগে তামিলনাড়ু সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওষুধ বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ওয়ালগ্রিনসও চেন্নাইয়ে একটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে চুক্তি করেছে। একই শহরে একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ চেন্নাইয়ের বৈশ্বিক ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধু উৎপাদন বা বিক্রয় কার্যক্রমের জন্য নয়, বরং গবেষণা, সফটওয়্যার উন্নয়ন, তথ্য বিশ্লেষণ এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্যও বিভিন্ন দেশে প্রযুক্তি কেন্দ্র স্থাপন করছে। এ ক্ষেত্রে একটি শহরের দক্ষ মানবসম্পদ, অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চেন্নাইয়ের দীর্ঘদিনের প্রযুক্তি ও শিল্পভিত্তিক অবকাঠামো এ ধরনের বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
তামিলনাড়ু সরকারও সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক ব্যবসায়িক সেবাখাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নতুন প্রযুক্তি কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে উচ্চ দক্ষতার কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ আসার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে শিল্পখাতের যোগাযোগ বাড়তে পারে।
চেন্নাইয়ে স্টারবাকসের প্রযুক্তি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৮০০ প্রযুক্তি পেশাজীবীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে শহরটির প্রযুক্তি খাতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হবে। তবে প্রকল্পটির বাস্তবায়নের সময়সূচি, বিনিয়োগের পরিমাণ, কেন্দ্রটির সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম এবং নিয়োগের বিস্তারিত কাঠামো এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন প্রযুক্তিকে তাদের মূল কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে, তখন স্টারবাকসের মতো একটি বৈশ্বিক ভোক্তা ব্র্যান্ডের প্রযুক্তি অবকাঠামো সম্প্রসারণও সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন। চেন্নাইয়ে নতুন কেন্দ্রটি কতটা বড় পরিসরে কাজ করবে এবং স্টারবাকসের আন্তর্জাতিক কার্যক্রমে এর ভূমিকা কতটা বিস্তৃত হবে, তা প্রকল্পটি এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে আরও পরিষ্কার হবে।
তবে আপাতত যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো চেন্নাইয়ে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। স্টারবাকস ও ওয়ালগ্রিনসের মতো প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ শহরটির প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক ব্যবসায়িক সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থান ও কার্যক্রম সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এর ফলে চেন্নাই শুধু ভারতের একটি বড় প্রযুক্তি শহর হিসেবেই নয়, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক কার্যক্রম পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও আরও এগিয়ে যেতে পারে