প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং আগামী ২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সফর করবেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে এই সফরে যাচ্ছেন তিনি। সফরকালে ওয়াশিংটনে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা, মতপার্থক্য ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও উন্নয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই নেতা আলোচনা করবেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার শি চিনপিংয়ের সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
দুই বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনৈতিক শক্তির রাষ্ট্রপ্রধানের এই সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা, তাইওয়ান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। এর মধ্যেই দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি যোগাযোগ অব্যাহত রাখার উদ্যোগ হিসেবে শি চিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফরকে দেখা হচ্ছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সফরের বিষয়ে বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, ছয় মাসের মধ্যে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের দুই রাষ্ট্রপ্রধানের পরস্পরের দেশে সফর করা একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।
গুও জিয়াকুন বলেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান মতপার্থক্যগুলো যথাযথভাবে সামাল দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বেইজিং। তাঁর বক্তব্যে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোকে আলোচনার মাধ্যমে পরিচালনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, শি চিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করবেন। একই সঙ্গে বিশ্ব শান্তি ও উন্নয়ন সম্পর্কেও আলোচনা হবে। চীনের পক্ষ থেকে দুই দেশের জনগণের জীবনযাত্রার উন্নতি এবং বৈশ্বিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্য সহযোগিতার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
এই সফরের আগে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ হয়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও টেলিফোনে কথা বলেন। ওই আলোচনায় ভবিষ্যৎ উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ এবং দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। চীনা পক্ষ রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ের কূটনীতিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে।
শি চিনপিংয়ের এবারের সফরকে ঘিরে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক বিষয়ও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে শুল্কনীতি, পণ্য আমদানি-রপ্তানি এবং সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে টানাপোড়েন হয়েছে। এর পাশাপাশি বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থ উপাদান, প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও দুই দেশের স্বার্থের পার্থক্য রয়েছে। আসন্ন বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
বিশেষ করে বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে আগের সমঝোতাগুলো কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যমান বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ বাড়ানোসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিষয়ে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে চীনের পক্ষ থেকে প্রযুক্তি-সংক্রান্ত কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও দুই রাষ্ট্রপ্রধানের আলোচনায় জায়গা পেতে পারে। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের কারণে এ খাতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা যেমন বাড়ছে, তেমনি এর ঝুঁকি ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন নিয়েও আলোচনা চলছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, শি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও আলোচনা করবেন।
দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি স্পর্শকাতর বিষয় তাইওয়ান। বাণিজ্য ও প্রযুক্তির পাশাপাশি তাইওয়ানকে ঘিরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের পার্থক্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আসন্ন বৈঠকে এ বিষয়ে দুই নেতা আলোচনা করবেন কি না এবং করলে কী ধরনের বক্তব্য সামনে আসে, সেদিকেও নজর থাকবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও আলোচনার সম্ভাব্য বিষয়গুলোর একটি। সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে চীন-যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ বৈঠকের সম্ভাব্য আলোচ্যসূচিতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সফরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও উচ্চপর্যায়ের প্রস্তুতির খবর এসেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, শি চিনপিং যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর সময় ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে তাকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানানোর পরিকল্পনা করছেন। ওয়াশিংটনে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বিভিন্ন আয়োজনও হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে দুই নেতা চীনের বাইরে একটি বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন এবং সে সময় অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে সম্মত হন। ওই বৈঠকে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখার কথাও বলা হয়েছিল এবং ট্রাম্প শি চিনপিংকে যুক্তরাষ্ট্র সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
চলতি বছরও দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। মে মাসে ট্রাম্প চীন সফর করেন এবং শি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে দুই নেতা চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং বিশ্ব শান্তি ও উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। দুই পক্ষ সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং মতপার্থক্য ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেয়।
সব মিলিয়ে শি চিনপিংয়ের ২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বরের যুক্তরাষ্ট্র সফর চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ হতে যাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে যেসব বিষয়ে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে এবং যেসব ক্ষেত্রে মতপার্থক্য রয়েছে, উভয় দিকই আলোচনায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বৈঠক শেষে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো নতুন সমঝোতা বা ঘোষণা আসে কি না, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলের।