প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকায় নিজস্ব অফিস খোলার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বিশ্বের অন্যতম বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ঘিরে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের ব্যস্ততার মধ্যেই প্রযুক্তি খাতে সম্ভাব্য এই নতুন উদ্যোগের কথা সামনে এলো।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মেটার সঙ্গে বৈঠকের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানসহ নিউইয়র্ক সফরের প্রথম দিনের কর্মসূচি নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
শামা ওবায়েদ জানান, মেটার সঙ্গে বৈঠকটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। বৈঠকে ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটির অফিস খোলার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি সেখানে থাকতে পারেননি বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে একটি স্থানীয় ফোকাল পয়েন্ট গড়ে তোলার বিষয়ে মেটার আগ্রহ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ফেসবুকের ব্যাপক ব্যবহার, অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার এবং ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারণকে সম্ভাবনার জায়গা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশে মেটার কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হলে এর প্রভাব শুধু প্রযুক্তি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, অনলাইন ব্যবসায়ী, ডিজিটাল বিপণন খাত এবং নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্যও এর মাধ্যমে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ফেসবুকনির্ভর ব্যবসা ও অনলাইন বিক্রয়ব্যবস্থা বাংলাদেশের ভোক্তা বাজারে ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা তৈরি করেছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বৈঠকে বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা আইন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তা, দায়িত্বশীলতা এবং আইনগত কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় কীভাবে করা যায়, সে বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশে ডিজিটাল কার্যক্রম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন নিরাপত্তা, তথ্যের সুরক্ষা এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহিতার প্রশ্নও সামনে এসেছে।
মেটার ঢাকা অফিস স্থাপনের সম্ভাব্য উদ্যোগের সঙ্গে এই আইনগত ও নীতিগত বিষয়গুলোর সম্পর্ক রয়েছে বলেও আলোচনায় উঠে এসেছে। একটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় পর্যায়ে কার্যক্রম বাড়লে সরকারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, ব্যবসায়িক সহযোগিতা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বয়ের সুযোগ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের ই-কমার্স ও অনলাইন ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণে মেটা সহযোগিতা করতে আগ্রহী বলেও জানিয়েছেন শামা ওবায়েদ। বর্তমানে দেশের অসংখ্য উদ্যোক্তা ফেসবুক ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পণ্য ও সেবা প্রচার এবং বিক্রি করছেন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার তুলনামূলক সহজ একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
এ ধরনের ব্যবসায় ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ, পণ্যের প্রচার এবং নতুন বাজারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মেটার প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির উপস্থিতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক হলে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অনলাইন ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও অনলাইন ব্যবসার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাগুলোও প্রযুক্তিনির্ভর বিপণন ও গ্রাহকসেবা ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারের সহযোগিতা দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
মেটার সম্ভাব্য ঢাকা অফিসের বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কাঠামো, সময়সূচি বা বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনাটি ফলপ্রসূ হওয়ার কথা জানানোয় বিষয়টি নিয়ে প্রযুক্তি ও ব্যবসা খাতে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অফিস স্থাপনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে মেটার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে আরও সরাসরি সাংগঠনিক উপস্থিতি তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় উপস্থিতি যেমন নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করতে পারে, তেমনি এর সঙ্গে দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য, অনলাইন প্রতারণা, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্বজুড়েই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ বাড়ছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের বিষয় সামনে রেখে নীতিগত সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে।
মেটার সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনায় সাইবার নিরাপত্তা আইন অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে ডিজিটাল ব্যবসা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন, অন্যদিকে নাগরিকদের অনলাইন নিরাপত্তা এবং আইনগত কাঠামো কার্যকর রাখার বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় বাংলাদেশের সঙ্গে মেটার বৈঠক হওয়াকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি সম্ভাবনা তুলে ধরার একটি সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের বড় বাজার, বিপুলসংখ্যক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী এবং দ্রুত বিকাশমান অনলাইন ব্যবসা আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হতে পারে।
তবে ঢাকায় মেটার অফিস স্থাপনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে সম্ভাব্য উদ্যোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে দুই পক্ষের আলোচনা, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে এ উদ্যোগ বাস্তবে কতটা এগোয়।
বাংলাদেশে ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার এবং অনলাইন ব্যবসার ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের মধ্যে মেটার এই আগ্রহ তাই নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয় উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিখাতের কর্মী এবং ডিজিটাল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তরুণদের জন্য ভবিষ্যতে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সরকারের মধ্যে নীতিগত সমন্বয় আরও বাড়লে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলার পথও শক্তিশালী হতে পারে।