৬৫৪৪ প্রতিষ্ঠানে সোলার, বরাদ্দ ৩৭০ কোটি টাকা :প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
৬৫৪৪ প্রতিষ্ঠানে সোলার, বরাদ্দ ৩৭০ কোটি টাকা :প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদকে কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। এর আওতায় স্থানীয় সরকারের অধীন ৬ হাজার ৫৪৪টি প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও গ্রোথ সেন্টারের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে মোট ৩৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

বুধবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন দপ্তর, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী এ তথ্য জানান। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে পরিষদ, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন দপ্তর, ওয়াসা, জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং দেশের বিভিন্ন হাট-বাজার ও গ্রোথ সেন্টার রয়েছে। সব মিলিয়ে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৪৪টি।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত বা ব্যবহারযোগ্য ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ব্যয়ের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের ওপরও কিছুটা চাপ কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।

মীর শাহে আলম বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের ছাদে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ বরাদ্দ থেকে অর্থ ছাড় করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদা আলাদা চিঠি দিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

সরকারের নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ২৭ জানুয়ারির মধ্যে কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ইতোমধ্যে ৩৭০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। অর্থাৎ বড় সংখ্যক সরকারি ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের কাজ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে এই কর্মসূচির বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে বরাদ্দের অর্থ দিয়ে প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হবে। এরপর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিজস্ব রাজস্ব থেকে অর্থ যোগ করে উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সামগ্রিকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব ব্যবহারে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সরকারের পরিকল্পনায় এর একটি অংশ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ নিজস্ব কাজে ব্যবহার করবে এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবে।

সরকারের হিসাবে, অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক সুবিধাও পেতে পারে। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা হিসাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে করা সরকারি বিনিয়োগ কয়েক বছরের মধ্যে উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থের মাধ্যমে ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে সরকারের দেওয়া অর্থ উঠে আসতে পারে। এরপর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত রাজস্ব আয়ের একটি উৎস তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের একটি অংশ নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে পাওয়ায় পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ পাবে।

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো। দিনের বেলায় সরকারি কার্যালয়, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, হাট-বাজার কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুতের যে চাহিদা থাকে, সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ তা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে। এতে প্রচলিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার পাশাপাশি একটি বিকল্প উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ব্যয়ের কারণে সৌরবিদ্যুৎসহ বিকল্প উৎসের প্রতি গুরুত্ব বাড়ছে। এ বাস্তবতায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করার উদ্যোগকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের বিস্তৃত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে এত বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানে একযোগে সৌর প্যানেল স্থাপন একটি বড় ধরনের বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জও তৈরি করবে। সঠিক মানের প্যানেল ও যন্ত্রপাতি নির্বাচন, স্থাপনকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা—সবগুলো বিষয় কার্যকরভাবে সমন্বয় করতে হবে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা ৬ হাজার ৫৪৪টি প্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে প্রশাসনিক ও কারিগরি সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এ ছাড়া সৌর প্যানেল স্থাপনের পর সেগুলোর কার্যকারিতা ধরে রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ধুলাবালি, আবহাওয়াজনিত প্রভাব, যন্ত্রপাতির ত্রুটি কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির কারণে সময়ের সঙ্গে উৎপাদন সক্ষমতা কমে যেতে পারে। তাই শুধু প্যানেল স্থাপন করলেই কর্মসূচির কাঙ্ক্ষিত সুফল নিশ্চিত হবে না; দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও প্রয়োজন হবে।

সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত এই কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও গুরুত্বপূর্ণ। বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানে সৌর প্যানেল স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রকল্পের ব্যয়, সরঞ্জামের মান, স্থাপনের অগ্রগতি এবং প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদনের তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হলে কর্মসূচির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা সহজ হবে। একই সঙ্গে কোথায় কত বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে এবং সেই বিদ্যুৎ কীভাবে ব্যবহার বা গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে, তারও নিয়মিত হিসাব রাখা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে ৩৭০ কোটি টাকার এই কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করার একটি বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক ১৫০ মেগাওয়াটের পাশাপাশি নিজস্ব অর্থ যোগ করে উৎপাদন দ্বিগুণ করে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াটে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা এবং পরবর্তী সময়ে স্থাপনাগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যুৎ ব্যয় ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত