প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়াম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। মামলায় চার দিনের রিমান্ডে থাকা গাজী নজরুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অন্যদিকে এক দিনের রিমান্ড শেষে তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মঙ্গলবার রিমান্ড শেষে মাকছুদাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের তেজগাঁও জোনাল টিমের পরিদর্শক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে মাকছুদার কাছ থেকে মামলার তদন্তে সহায়ক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। পরে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
এর আগে সোমবার গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে গাজী নজরুলের চার দিনের এবং মাকছুদার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রিমান্ড শেষে মাকছুদাকে কারাগারে পাঠানো হলেও গাজী নজরুলকে এখনো ডিবি হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
মরিয়ামের মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউসংলগ্ন ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাটে। পুলিশ সেখানে মরিয়ামের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে। ঘটনার পর গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়। পরে মরিয়ামের বাবা মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন।
মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়ামের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। মামলার তদন্তভার পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওবায়দুর রহমানকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি বলে জানা গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে গাজী নজরুল ঘটনার দিনের নিজের অবস্থান ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন। তাঁর দাবি, রোববার সকাল থেকে তিনি আদালতে ছিলেন। পরে দুপুরে ন্যাম ভবনের বাসায় ফিরে আসেন। এ সময় তাঁর নির্বাচনী এলাকা সাতক্ষীরা থেকে আসা কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য বাসায় অপেক্ষা করছিলেন।
গাজী নজরুলের ভাষ্য অনুযায়ী, দুপুরের খাবার শেষে তিনি ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁরা চলে যাওয়ার পর বিকেল ৫টার দিকে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ামকে খোঁজ করতে যান। তখন ঘরের দরজা বন্ধ দেখতে পান। পরে জানালা দিয়ে মরিয়ামকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান বলে তদন্তকারীদের জানিয়েছেন তিনি।
জিজ্ঞাসাবাদে গাজী নজরুল আরও দাবি করেছেন, তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিল। ঘটনার দিন দুপুরে সাতক্ষীরা থেকে কয়েকজন ব্যক্তি মরিয়ামকে ভিডিওকলে দেখতে চেয়েছিলেন বলেও তিনি জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তখন ভিডিওকলের মাধ্যমে মরিয়ামকে তাঁদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল।
তবে মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য আলামত যাচাই করে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নির্ধারণ করা হবে। মামলায় কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
এদিকে সোমবার রাতে মরিয়ামের মরদেহ তাঁর পৈতৃক বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগরের চৌদ্দরশি গ্রামে নেওয়া হয়। রাত ১১টার দিকে মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে রাত পৌনে ১টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। দাফনের সময় পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
মরিয়ামের মৃত্যু ঘিরে এর আগে থেকেই গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। কয়েক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজী নজরুল ও মরিয়ামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের কিছু ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। তখন বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। শুরুতে তাঁর রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাকর্মী ভিডিওগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন।
পরে গাজী নজরুল নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে মরিয়ামকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি দাবি করেন, পারিবারিকভাবে এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে গত ১৭ জুন তাঁদের বিয়ে হয়। পরে জুলাই মাসে তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মরিয়ামের বাবার ব্যবসায়িক কার্যালয়ে যাওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেছিলেন।
গাজী নজরুলের সেই বক্তব্য অনুযায়ী, ওই কার্যালয়ে অবস্থানের সময় তাঁর গাড়িচালক ও মরিয়ামের মামা ওবায়দুর রহমান বাইরে যান। পরে কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করে তাঁদের জিম্মি করে অর্থ আদায় করেন বলে তিনি অভিযোগ করেছিলেন। তাঁর আরও দাবি ছিল, ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিকভাবেও গাজী নজরুলকে নিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। পরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে। দলটির পক্ষ থেকে তখন তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক তদন্তের কথা জানানো হয়েছিল।
বর্তমান মামলায় মরিয়ামের পরিবারের পক্ষ থেকে গাজী নজরুল, মাকছুদা ও ওবায়দুরের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে। মরিয়ামের বাবা মামলায় তাঁর মেয়েকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগও করেছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।
অন্যদিকে গাজী নজরুল আদালতে নিজের ও প্রথম স্ত্রীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি অভিযোগগুলোকে মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। ফলে মামলার তদন্তে একদিকে বাদীপক্ষের অভিযোগ, অন্যদিকে আসামিপক্ষের বক্তব্য—দুই দিকই বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
মরিয়ামের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে যে অভিযোগগুলো করা হয়েছে এবং গাজী নজরুলের পক্ষ থেকে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে পার্থক্য রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ, ঘটনাস্থলের তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা করে বিষয়গুলো যাচাই করছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। বিশেষ করে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযোগের পাশাপাশি প্রমাণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তে যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে।
এদিকে গাজী নজরুলকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত থাকায় মামলার তদন্তে নতুন কোনো তথ্য সামনে আসে কি না, সেদিকে নজর রয়েছে। একই সঙ্গে মাকছুদার কারাগারে পাঠানোর পর মামলার অন্য আসামি ওবায়দুর রহমানের অবস্থান এবং তাঁকে গ্রেপ্তারের বিষয়টিও তদন্তের অংশ হিসেবে রয়েছে। মরিয়ামের মৃত্যুর ঘটনায় প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণে তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।