রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও সম্মানজনকভাবে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থানকালে জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান।

মঙ্গলবার নিউইয়র্কের হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল হোটেলে প্রধানমন্ত্রীর আবাসস্থলে জুলি বিশপের সঙ্গে তার সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দীর্ঘদিন ধরে চলমান রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং এ সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট কেবল একটি মানবিক সংকট নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বছরের পর বছর ধরে কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবিরে বসবাস করছেন। তাদের জন্য খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও অন্যান্য মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে নিয়মিতভাবে বড় ধরনের মানবিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

এই বাস্তবতায় রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনকে সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জুলি বিশপের বৈঠকেও সেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পেয়েছে।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সম্মানজনকভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা কামনা করেন। বাংলাদেশের অবস্থান অনুযায়ী, শুধু শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখাই যথেষ্ট নয়; তাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতেও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই সমাধানের জন্য মিয়ানমারের অভ্যন্তরে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা জরুরি, যেখানে প্রত্যাবাসনকারীরা নিজেদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারেন। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক আলোচনাতেও সংকটের মূল কারণ মোকাবিলা এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে জুলি বিশপের বৈঠকেও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের জন্য সংকটের মূল কারণ মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গা সংকট। এর আগে মঙ্গলবার জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহের সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি। সেই আলোচনায়ও নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়ে আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের বিকল্প নেই।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার ও সমন্বিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বারহাম সালেহ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

রোহিঙ্গা সংকটের কারণে বাংলাদেশের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার একটি বড় অংশ বহন করছে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠী। দীর্ঘদিন ধরে শরণার্থী শিবিরগুলোর বিস্তৃতি, পরিবেশগত চাপ, স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাহিদা এবং কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ঘাটতি তৈরি হলে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মানবিক কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সময়ে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগও যুক্ত। এ কারণে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ধারাবাহিক বৈঠকগুলোতে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি তুলে ধরা বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করছে।

জুলি বিশপের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার জন্য সহযোগিতার আহ্বান জানানো হলেও এর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে মিয়ানমারের পরিস্থিতি, প্রত্যাবাসনের পরিবেশ, আন্তর্জাতিক উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর।

রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিনের অনিশ্চিত জীবনও সংকটটির মানবিক দিককে আরও গভীর করে তুলেছে। নিজ দেশ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোরদের একটি বড় অংশ জন্মের পর থেকেই শিবিরের পরিবেশে বসবাস করছে। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্কদের জীবনে কর্মসংস্থান ও আত্মনির্ভরতার সীমাবদ্ধতাও সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে।

এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকে শুধু সীমান্ত অতিক্রম করে নিজ দেশে ফেরার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে হবে না। প্রত্যাবাসন টেকসই করতে তাদের নাগরিক ও মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা, জীবিকা এবং নিজ ভূমিতে মর্যাদার সঙ্গে বসবাসের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চাওয়ার ক্ষেত্রে এসব বাস্তবতাই বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অধিবেশনের বিভিন্ন বৈঠক ও পার্শ্ব বৈঠকে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় আলোচনায় আসছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ও আঞ্চলিক অগ্রাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে এ সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

জুলি বিশপের সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের বিষয়টি সামনে আনল। এখন প্রত্যাশা হচ্ছে, কূটনৈতিক আলোচনা থেকে কার্যকর আন্তর্জাতিক উদ্যোগে অগ্রগতি আসবে এবং মিয়ানমারে এমন পরিবেশ তৈরির পথ সুগম হবে, যেখানে রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে নিজেদের মাতৃভূমিতে ফিরতে পারবেন। বাংলাদেশের জন্য এই প্রত্যাবাসন শুধু একটি কূটনৈতিক লক্ষ্য নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় মানুষের ভবিষ্যতের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত