প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ছাত্রদল রাজপথে সক্রিয় না থাকলে ছাত্রলীগ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে পিটিয়ে আবারও ‘গুপ্ত’ করে দেবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
রাশেদ খাঁনের এই বক্তব্যে দেশের সাম্প্রতিক ছাত্ররাজনীতি, বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এবং ছাত্রলীগকে ঘিরে রাজনৈতিক বিরোধের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। বিশেষ করে রাজশাহীতে ছাত্রদলের রাজনৈতিক তৎপরতা এবং জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে তাদের বিরোধকে কেন্দ্র করে তিনি নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
ফেসবুক পোস্টে রাশেদ খাঁন প্রশ্ন তোলেন, ছাত্রলীগের ভয়ে যারা একসময় গোপনে থাকতেন কিংবা ছাত্রলীগের পরিচয়ে রাজনৈতিকভাবে টিকে ছিলেন, তারা কীভাবে ছাত্রদলকে পিটিয়ে রাজশাহী ছাড়া করতে চান। এরপর তিনি বলেন, ছাত্রদল রাজপথে সক্রিয় না থাকলে ছাত্রলীগ জামায়াত-শিবিরকে পিটিয়ে আবারও ‘গুপ্ত’ করে দেবে।
তিনি লেখেন, ‘এই বাস্তবতা কেন এরা বুঝতে চায় না?’ তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, রাজনৈতিক মাঠে ছাত্রদলের সক্রিয় উপস্থিতি না থাকলে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে এবং এর প্রভাব জামায়াত-শিবিরের ওপরও পড়তে পারে।
রাশেদ খাঁন তাঁর বক্তব্যে বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত-শিবিরের কর্মকাণ্ড নিয়েও সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগের ভাষায় বলেন, বিরোধী দল হয়েও তারা সরকারি দলের লোকজনকে এলাকায় থাকতে না দেওয়ার মতো আচরণ করছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে তারা ক্ষমতায় গেলে পরিস্থিতি আরও কঠোর হতে পারে।
তবে এসব বক্তব্য রাশেদ খাঁনের রাজনৈতিক মন্তব্য ও মূল্যায়ন। এগুলোকে কোনো ঘটনার স্বাধীনভাবে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর পোস্টে তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে জামায়াত-শিবিরের কর্মকাণ্ড এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আচরণ সম্পর্কে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
জামায়াত-শিবিরের সমালোচনা করতে গিয়ে রাশেদ খাঁন তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত-শিবির ‘মজলুম থেকে জালিম’ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, জামায়াত ‘জালিমের’ পরিণতি আওয়ামী লীগের মতো হবে।
রাশেদ খাঁনের বক্তব্যে আওয়ামী লীগের অতীত রাজনৈতিক ভূমিকার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা যেমন বিএনপিকে এক দিনও শান্তিতে দেশ পরিচালনা করতে দেবেন না বলে বক্তব্য দিয়েছিলেন, জামায়াত-শিবিরও একই পথ অনুসরণ করছে বলে তাঁর মনে হচ্ছে। এ কারণে তিনি জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের লাগাম টেনে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
তিনি আরও মন্তব্য করেন, ‘এদেরকে কাঁচুমাচু করে দেশ পরিচালনার সুযোগ নেই।’ তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জামায়াত-শিবিরের ভূমিকা এবং তাদের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আচরণ নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন।
রাশেদ খাঁনের মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক পরিসরে ছাত্রসংগঠনগুলোর তৎপরতা নিয়ে আলোচনা চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক বিরোধ, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি এবং সংঘর্ষের খবরও প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে ছাত্রসংগঠনগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান ও রাজপথের সক্রিয়তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের বক্তব্যও গুরুত্ব পাচ্ছে।
ছাত্রদল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ছাত্রসংগঠন হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্রসংগঠন হিসেবে রাজনীতিতে পরিচিত। ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন হিসেবে দীর্ঘ সময় দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিল। এই তিন সংগঠনের রাজনৈতিক অবস্থান ও পারস্পরিক বিরোধ বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির আলোচিত বিষয়গুলোর একটি।
রাশেদ খাঁনের বক্তব্যে রাজশাহীর প্রসঙ্গও বিশেষভাবে এসেছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যারা ছাত্রলীগের ভয়ে অতীতে গোপনে থাকতেন, তারা কীভাবে ছাত্রদলকে রাজশাহী থেকে সরিয়ে দিতে চায়। তাঁর এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি রাজশাহীতে ছাত্ররাজনীতির সাম্প্রতিক পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
এর আগে সেপ্টেম্বর মাসেও রাশেদ খাঁন জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে একাধিক বক্তব্য দিয়েছেন। সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যে তিনি জামায়াতের বিরুদ্ধে রংপুরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও তুলেছিলেন। একই সময়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম রাশেদ খাঁনের জামায়াত-শিবিরবিরোধী বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
ফলে বুধবারের নতুন বক্তব্যটি বিচ্ছিন্ন কোনো মন্তব্যের পরিবর্তে জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে রাশেদ খাঁনের ধারাবাহিক সমালোচনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিভিন্ন পক্ষের রাজনৈতিক বক্তব্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দলের অবস্থান ও পাল্টা বক্তব্যও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
ছাত্ররাজনীতিতে সহিংসতার প্রসঙ্গও তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ‘পিটিয়ে’ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার যে ভাষা তিনি ব্যবহার করেছেন, তা মূলত তাঁর উদ্ধৃত বক্তব্যের অংশ। একই সঙ্গে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, একটি ছাত্রসংগঠন দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে অন্য রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন আরও বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দিক থেকে দেশের ক্যাম্পাস রাজনীতিতে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের সক্রিয়তা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। সংগঠনগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা যদি সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। কিন্তু সংঘর্ষ, হামলা কিংবা জোরপূর্বক কোনো সংগঠনকে এলাকা বা ক্যাম্পাস থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠলে তা শিক্ষার পরিবেশ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
রাশেদ খাঁনের বক্তব্যে ভবিষ্যৎ ক্ষমতার রাজনীতি নিয়েও আশঙ্কার কথা এসেছে। তিনি মনে করেন, জামায়াত-শিবিরকে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণে না রাখলে তারা ভবিষ্যতে আরও কঠোর হয়ে উঠতে পারে। এটি তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মূল্যায়ন এবং এর সত্যতা বা ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত এই বক্তব্য থেকে পাওয়া যায় না।
সব মিলিয়ে রাশেদ খাঁনের সাম্প্রতিক ফেসবুক পোস্টে ছাত্রদলের রাজনৈতিক সক্রিয়তা, ছাত্রলীগের অতীত ভূমিকা এবং জামায়াত-শিবিরের বর্তমান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ছাত্ররাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মতপার্থক্য যেন সহিংসতায় রূপ না নেয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় থাকে—এ বিষয়টিও সামনে এসেছে।