প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণ এবং নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর পরিকল্পনার মধ্যে উড়োজাহাজ বহর বাড়ানোর উদ্যোগে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির পর প্রয়োজন অনুযায়ী ইউরোপীয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের সঙ্গেও ভবিষ্যতে আলোচনা হতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, দেশের বিমান পরিবহন খাতের ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে উড়োজাহাজ সংগ্রহের ক্ষেত্রে একাধিক বিকল্প খোলা রাখার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
স্থানীয় সময় বুধবার নিউইয়র্কের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন এসব কথা বলেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের মধ্যে বোয়িংয়ের সঙ্গে নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। মাহদী আমিন জানান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বোয়িংয়ের কাছ থেকে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তি করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং নতুন নতুন রুট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ কারণে দেশের প্রয়োজন ও চাহিদার ভিত্তিতে নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রয়োজন অনুযায়ী বিমান কিনবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে বহরের আকার ও রুট সম্প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উড়োজাহাজ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মাহদী আমিনের বক্তব্য অনুযায়ী, বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে অন্য কোনো নির্মাতার সঙ্গে আলোচনা হবে না। প্রয়োজন দেখা দিলে এয়ারবাসের সঙ্গেও আলোচনা হতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন। ফলে দেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার বহর সম্প্রসারণে ভবিষ্যতে বোয়িং ও এয়ারবাস—দুই নির্মাতার উড়োজাহাজ নিয়েই সম্ভাব্য আলোচনা সামনে আসতে পারে।
বোয়িংয়ের সঙ্গে নতুন চুক্তির অনুষ্ঠানে মার্কিন সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক, উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লান্ডাউ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উইলিয়াম কিমিট এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস পল কাপুর। এ কারণে উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিটি শুধু বিমানবহর সম্প্রসারণের একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আলোচনায় এসেছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এর আগে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা নিয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি চুক্তি হয়েছিল। নতুন ১১টি উড়োজাহাজ যুক্ত হলে বোয়িং থেকে বাংলাদেশের পরিকল্পিত উড়োজাহাজ সংগ্রহের সংখ্যা ২৫টিতে দাঁড়ানোর কথা। তবে নতুন ১১টি উড়োজাহাজের নির্দিষ্ট মডেল, মোট মূল্য, অর্থায়নের শর্ত এবং সরবরাহের সময়সূচি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বিমানবহর সম্প্রসারণের পেছনে মূল লক্ষ্য হিসেবে নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু এবং বিদ্যমান রুটে সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি সামনে এসেছে। যাত্রী পরিবহনের চাহিদা, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং দেশের এভিয়েশন খাতের সম্প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ প্রয়োজন বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ফলে নতুন বিমান কেনার সিদ্ধান্তকে দীর্ঘমেয়াদি বহর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে উড়োজাহাজ কেনার মতো বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। কোন রুটে কত যাত্রী চলাচল করছে, ভবিষ্যতে কোন গন্তব্যে নতুন রুট চালুর সম্ভাবনা রয়েছে, উড়োজাহাজ পরিচালনার ব্যয় কত হবে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণের সক্ষমতা কীভাবে বাড়ানো হবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে উড়োজাহাজের ক্রয়মূল্য, অর্থায়নের শর্ত এবং সরবরাহের সময়সূচিও জাতীয় বিমান সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
মাহদী আমিন সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরের বিভিন্ন কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, সফরের দ্বিতীয় দিনে স্বাস্থ্য, কৃষি, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে বৈঠক হয়েছে। গেটস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে বৈঠকে স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে সহযোগিতা বাড়ানো, কৃষকদের প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটও প্রধানমন্ত্রীর সফরের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে জাতিসংঘের সাইডলাইনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে এবং তাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসায় বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়ছে। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশ সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে। প্রয়োজনে বন্ধুত্বপূর্ণ ও নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সংলাপের সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখার কথাও তিনি জানান। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার কথা জানান তিনি। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি নদী ও খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, নবায়নযোগ্য ও সৌর জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীন ও ভারতের ভূমিকা সম্পর্কেও প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি জানান, বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উভয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট দেশ ও অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি। কূটনীতিতে সব দরজা খোলা রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন মাহদী আমিন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর চার দিনের জাতিসংঘ সফরের আরও কর্মসূচি রয়েছে বলে জানান তিনি। সফরের অংশ হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী বাংলায় বক্তব্য দেবেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
সব মিলিয়ে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত সম্প্রসারণের পরিকল্পনাকে সামনে এনেছে। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী ভবিষ্যতে এয়ারবাসের সঙ্গেও আলোচনার সম্ভাবনার কথা জানিয়ে সরকার উড়োজাহাজ সংগ্রহের ক্ষেত্রে চাহিদাভিত্তিক সিদ্ধান্তের বার্তা দিয়েছে। এখন নতুন উড়োজাহাজগুলোর মডেল, মূল্য, অর্থায়ন ও সরবরাহের সময়সূচি এবং ভবিষ্যৎ রুট পরিকল্পনা স্পষ্ট হলে দেশের বিমান পরিবহন খাতের ওপর এই সম্প্রসারণের বাস্তব প্রভাব আরও পরিষ্কার হবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত