রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান মিয়ানমারেই: প্রধানমন্ত্রী

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
আগামীকাল ফেনী সফরে প্রধানমন্ত্রী, থাকছে দিনভর নানা কর্মসূচি

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই ও স্থায়ী সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই সংকটের অবসানে শুধু মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পরিবর্তে এর মূল কারণ মোকাবিলা এবং বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর আন্তর্জাতিক উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক একটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনকে ঘিরে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তিনি রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান পরিস্থিতি, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত বাস্তবতা এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে মানবিক সহায়তা দেওয়া হলেও কেবল সহায়তার মাধ্যমে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সংকটের উৎস চিহ্নিত করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে এর সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তাঁর ভাষায়, প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপ এবং বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর ব্যবস্থাপনা থেকে তাদের বাস্তুচ্যুতির অবসানের দিকে এখন এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।

রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা এখনো বিভিন্ন ধরনের নিপীড়ন ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। নির্বিচারে আটক, চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ এবং জোরপূর্বক শ্রমের মতো পরিস্থিতির পাশাপাশি সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এসব কারণে রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার মতো অনুকূল পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে বলেও অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাখাইন রাজ্যে চলমান অস্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ও মর্যাদার সঙ্গে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় আস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা যেন অনির্দিষ্টকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় না থাকে, সেটিই বাংলাদেশের প্রত্যাশা। তারা নিজেদের অধিকার সুরক্ষিত রেখে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণভাবে মিয়ানমারে নিজেদের ঘরে ফিরে যেতে পারে—বাংলাদেশ সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।

তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান, রোহিঙ্গা সংকটকে কেবল একটি মানবিক সংকট হিসেবে বিবেচনা না করে এর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত মূল কারণগুলোর প্রতিও নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক অংশীজনদের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য প্রধানমন্ত্রী একটি সুস্পষ্ট, বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর রোডম্যাপ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের কাঠামো তৈরি করতে হবে। মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা এবং তাদের কূটনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

একই সঙ্গে রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সব ধরনের সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। নিজভূমিতে রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে তাদের মধ্যে নিজ দেশে ফেরার বিষয়ে আস্থা তৈরি হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রত্যাবাসন কার্যকর করতে হলে শুধু সীমান্ত পেরিয়ে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা নয়, বরং ফিরে যাওয়ার পর নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়।

রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে কক্সবাজারে দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আসা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতির কারণে স্থানীয় জনগণের উন্নয়ন, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের সঙ্গে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় গাম্বিয়ার নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্ত ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন।

রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টিও যুক্ত হয়ে পড়ছে বলে অনুষ্ঠানে উল্লেখ করা হয়। মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা এবং অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, এসব অপরাধ শুধু সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর নিরাপত্তাকেই প্রভাবিত করে না, বরং বৃহত্তর অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। বিশেষ করে কক্সবাজারে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বসবাসের কারণে মানবিক সহায়তা, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী এই পরিস্থিতির প্রভাব স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও পড়ছে। ফলে প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন ও উন্নয়নকেও গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক সহায়তা অবশ্যই প্রয়োজনীয়, তবে সেই সহায়তা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার বিকল্প হতে পারে না। বাংলাদেশ অনির্দিষ্টকাল এককভাবে রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব বহন করে যাবে—এমন পরিস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য মিয়ানমারের ভেতরে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাংলাদেশের প্রধান প্রত্যাশা হলো নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। তবে প্রত্যাবাসন যাতে নতুন করে অনিশ্চয়তা বা নিরাপত্তাহীনতার কারণ না হয়, সে বিষয়েও সতর্কতা প্রয়োজন। রোহিঙ্গাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না করে তাদের ফেরত পাঠানো হলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নাও আসতে পারে—বাংলাদেশের বক্তব্যে এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।

নিউইয়র্কের এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে তাই মানবিক সহায়তার পাশাপাশি রাজনৈতিক সমাধান, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সংকটের মূল উৎস মিয়ানমারে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি যে আহ্বান জানানো হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা।

দীর্ঘদিনের এই সংকটের স্থায়ী সমাধান কত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করছে মিয়ানমারের পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কার্যকর সহযোগিতার ওপর। তবে বাংলাদেশের অবস্থান অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের অনির্দিষ্টকাল শরণার্থী হিসেবে রেখে নয়, বরং তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিজভূমিতে প্রত্যাবাসনের মধ্য দিয়েই সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com