মিয়ানমারে পাচারের আগে ৯৭৫ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
মিয়ানমারে পাচারের আগে ৯৭৫ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে সাগরপথে মিয়ানমারে পাচারের সময় ৯৭৫ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। এ সময় চারটি ট্রাক ও একটি মাছ ধরার ট্রলারও জব্দ করা হয়েছে। অভিযানের সময় তিনজনকে আটক করা হলেও পাচারকারী চক্রের কথিত মূল হোতাদের কয়েকজন ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। উদ্ধার করা সারের আনুমানিক মূল্য সরকারি নির্ধারিত দরে ১২ লাখ ১৮ হাজার ৭৫০ টাকা।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টার দিকে মিরসরাই উপজেলার ইছাখালী ইউনিয়নের বঙ্গোপসাগর উপকূলে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। কোস্ট গার্ডের সদস্যরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারেন, চট্টগ্রামের মাঝিরঘাট এলাকা থেকে কয়েকটি ট্রাকে করে বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া সার উপকূলীয় এলাকায় নেওয়া হয়েছে। পরে সেই সার সাগরপথে একটি মাছ ধরার ট্রলারে তুলে মিয়ানমারে পাচারের প্রস্তুতি চলছে।

তথ্যের ভিত্তিতে কোস্ট গার্ডের একটি টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালে সেখানে সন্দেহজনক তৎপরতা দেখতে পায়। চারটি ট্রাক থেকে আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা মাছ ধরার ট্রলারে বস্তাভর্তি সার তোলার কাজ চলছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি টের পেয়ে সেখানে থাকা পাচারকারী চক্রের কয়েকজন সদস্য দ্রুত পালিয়ে যায়। তবে ঘটনাস্থল থেকে ট্রাকচালক ইয়াছিন এবং শ্রমিক মনির হোসেন ও ইসমাইলকে আটক করা হয়।

অভিযানের পর চারটি ট্রাক ও একটি মাছ ধরার ট্রলার জব্দ করা হয়। এসব যানবাহনের মাধ্যমে কীভাবে বিপুল পরিমাণ সার উপকূলে আনা হয়েছিল এবং কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল, তা নিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে তদন্তের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কারণ এত বিপুল পরিমাণ সার এক জায়গায় এনে সাগরপথে অন্য দেশে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়ার ঘটনায় সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থার একাধিক ধাপ জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চারটি ট্রাকে মোট ১ হাজার ১০০ বস্তা সার থাকার কথা ছিল। তবে অভিযান শেষে ট্রাক ও ট্রলার মিলিয়ে ৯৭৫ বস্তা ইউরিয়া সার উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ১২৫ বস্তা সার অভিযানের আগেই অন্য একটি ট্রলারে সরিয়ে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে জব্দ করা সারের বাইরে আরও একটি অংশ কোথায় গেছে এবং সেটি শেষ পর্যন্ত পাচার হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঘটনার খবর পেয়ে মিরসরাই উপজেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (ভূমি) তানভীরুল কাদের এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় আটক তিনজনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে আর্থিক জরিমানা করা হয়। ট্রাকচালক ইয়াছিনকে এক হাজার টাকা এবং শ্রমিক মনির হোসেন ও ইসমাইলকে ২০০ টাকা করে জরিমানা করা হয়।

অভিযানে উদ্ধার হওয়া সার নিয়ে পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। সরকারি নির্ধারিত মূল্য কেজিপ্রতি ২৫ টাকা ধরে ৯৭৫ বস্তা সার প্রকাশ্য নিলামে বিক্রি করা হয়। উদ্ধার হওয়া সারের মোট মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১২ লাখ ১৮ হাজার ৭৫০ টাকা। প্রশাসনের এই পদক্ষেপের ফলে জব্দ করা সার দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকার পরিবর্তে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ব্যবহারের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

মিরসরাই কোস্ট গার্ডের পিওআর মোহাম্মদ রবিউল হোসেন জানিয়েছেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এ অভিযান সাগরপথে চোরাচালান প্রতিরোধে নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। উপকূলীয় অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের পণ্য অবৈধভাবে দেশের বাইরে নেওয়ার চেষ্টা ঠেকাতে কোস্ট গার্ডের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় জানিয়েছেন, উদ্ধার করা ইউরিয়া সার মিরসরাই উপজেলার সরকারি বরাদ্দের নয়। এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশে কৃষকদের জন্য সার সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় সরকারি পর্যায়ে নির্ধারিত কাঠামো রয়েছে। ফলে জব্দ করা সার মিরসরাইয়ের কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত না হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের বরাদ্দ থেকে সরাসরি এই চালান সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

তবে বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া সার দেশের বাইরে পাচারের চেষ্টা কৃষি খাতের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। ইউরিয়া দেশের কৃষিতে বহুল ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ সার। কৃষকের উৎপাদন খরচ, ফসলের ফলন এবং কৃষিপণ্যের বাজারদরের সঙ্গে সারের প্রাপ্যতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে বৈধ সরবরাহব্যবস্থার বাইরে বিপুল পরিমাণ সার স্থানান্তর বা পাচারের চেষ্টা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও তদন্তের প্রয়োজন হয়।

মিরসরাইয়ের উপকূলীয় এলাকা ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সাগরপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ রয়েছে। বৈধ বাণিজ্য ও মৎস্য কার্যক্রমের পাশাপাশি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই ধরনের পথকে অবৈধ পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহারের চেষ্টা করা হতে পারে। কোস্ট গার্ডের সাম্প্রতিক অভিযানের ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলে রাতের বেলায় পণ্য ওঠানামা এবং সন্দেহজনক নৌযান চলাচলের ওপর নজরদারি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযানের সময় কয়েকজন পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে আটক করা সম্ভব হলেও যাদের মূল পরিকল্পনাকারী বা সংগঠক হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে, তাদের কেউ কেউ পালিয়ে যাওয়ায় পুরো চক্রের পরিচয় এবং কার্যক্রম সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে সব তথ্য পাওয়া যায়নি। উদ্ধার হওয়া সার কোথা থেকে আনা হয়েছিল, কার মাধ্যমে পরিবহন করা হয়েছিল, ট্রলারটির মালিকানা কার এবং সাগরপথে এর গন্তব্য কোথায় ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আরও তদন্ত প্রয়োজন হতে পারে।

বিশেষ করে ১ হাজার ১০০ বস্তা সার পরিবহনের প্রস্তুতির তথ্য এবং শেষ পর্যন্ত ৯৭৫ বস্তা উদ্ধারের বিষয়টি তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বাকি ১২৫ বস্তা সার অন্য একটি ট্রলারে সরিয়ে নেওয়া হয়ে থাকলে সেটি কোথায় নেওয়া হয়েছে, কারা এতে জড়িত এবং সেটি দেশের বাইরে পাঠানো সম্ভব হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এসব তথ্য উদঘাটিত হলে ঘটনার প্রকৃত পরিধি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছেও এ ধরনের অভিযান গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। উপকূলীয় এলাকায় রাতের অন্ধকারে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন ও নৌযানে ওঠানোর মতো কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের নজরেও আসতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা এবং সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার সংস্কৃতি থাকলে চোরাচালান প্রতিরোধে তা সহায়ক হতে পারে।

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া সার জব্দের এই ঘটনা শুধু একটি চালান আটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে দেশের কৃষি উপকরণের সরবরাহব্যবস্থা, সীমান্ত ও উপকূলীয় নিরাপত্তা এবং চোরাচালান প্রতিরোধের বিষয়ও জড়িত। ফলে আটক ব্যক্তিদের প্রাথমিক জরিমানা এবং সার নিলামে বিক্রির পাশাপাশি পুরো ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করা এবং সার পরিবহনের উৎস ও সম্ভাব্য গন্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য বের করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মিরসরাইয়ের বঙ্গোপসাগর উপকূলে রাতের এই অভিযানে ৯৭৫ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ হওয়ার মধ্য দিয়ে একটি সম্ভাব্য বড় চালান দেশের বাইরে যাওয়ার আগেই থেমে গেছে। তবে ঘটনাটির পূর্ণ চিত্র জানতে উদ্ধার হওয়া সার, জব্দ করা যানবাহন, আটক ব্যক্তিদের তথ্য এবং পালিয়ে যাওয়া সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে পরবর্তী তদন্তের ফলাফলের দিকে নজর থাকবে। একই সঙ্গে উপকূলীয় পথে যাতে এ ধরনের পণ্য পাচারের চেষ্টা আর না হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি আরও কার্যকর হবে—এটাই প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত