প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে আবারও সহিংসতার ঘটনায় চার নাগা নাগরিক নিহত হয়েছেন। রাজ্যের কামজং জেলার মিয়ানমার সীমান্তবর্তী পিলং গ্রামের কাছে বৃহস্পতিবার সংঘটিত হামলায় তাঁদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের প্রাথমিক তথ্য থেকে জানা গেছে। নিহতদের সবাই টাংখুল নাগা সম্প্রদায়ের সদস্য। একই সময়ে কাংপোকপি জেলার তিনটি গ্রামে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় প্রায় ৪০টি বাড়ি এবং একটি চার্চ পুড়ে গেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। পরিস্থিতির কারণে বেশ কয়েকটি পরিবারের মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনা মণিপুরে দীর্ঘদিন ধরে চলা জাতিগত ও সশস্ত্র সংঘাতের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন দুর্গম এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। প্রত্যন্ত এসব অঞ্চলে যোগাযোগ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় হামলার পরপরই ঘটনাস্থলে পৌঁছানো এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
পিলং গ্রামের ঘটনায় নিহত চারজনকে ফামি জাজো, নিংথেম কাশাক, বেটারসন জাজো এবং ভারেইশিম জাজো হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ভারেইশিম জাজো ও ফামি জাজো বাবা-ছেলে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, হামলার সময় কয়েকজন নাগরিক ওই এলাকায় ছিলেন। হামলার পর একজন ব্যক্তি সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পিলং গ্রামটি মণিপুরের কামজং জেলার একটি প্রত্যন্ত সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় এলাকাটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই স্পর্শকাতর। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানিয়েছে, সীমান্তের ওপার থেকে আসা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা হামলার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে হামলাকারীদের পরিচয় ও তাদের সুনির্দিষ্ট সংশ্লিষ্টতা তদন্তের বিষয়। স্থানীয় কয়েকটি সংগঠন ও রাজনৈতিক নেতারা কুকি ন্যাশনাল আর্মি-বর্মা বা কেএনএ-বিকে দায়ী করেছেন। এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হয়নি।
ঘটনার পর নিরাপত্তা বাহিনী এলাকায় তল্লাশি চালায় এবং নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হয়। সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় হামলার স্থান হওয়ায় উদ্ধার ও তদন্ত কার্যক্রমেও নিরাপত্তাজনিত নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং নতুন করে কোনো সহিংসতা যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
চার নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচাঁদ সিং তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সমাজে এ ধরনের সহিংসতার কোনো স্থান নেই এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
নাগা পিপলস ফ্রন্টের বিধায়ক অবাংবাউ নিউমাইও হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মণিপুরের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা ও বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক। তিনি সহিংসতা পরিহার করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সামাজিক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে কাংপোকপি জেলার মাকুই চাম্রিউপিউ, মাকুই থানাম্বা ও মাকুই থেব্রাম গ্রামেও হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, তিনটি গ্রামে প্রায় ৪০টি বাড়ি, একটি চার্চ এবং কয়েকটি সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা পুড়ে গেছে। একটি প্রতিবেদনে তিন গ্রামে পুড়ে যাওয়া বাড়ির সংখ্যা ৪১টি পর্যন্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার দুপুরের পর থেকে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ চলে। চাম্রিউপিউ গ্রামে ১৭টির মতো বাড়ি, থানাম্বায় আটটি এবং থেব্রামে ১৬টি বাড়ি আগুনে পুড়ে যাওয়ার কথা জানা গেছে। হামলার সময় আতঙ্কিত বাসিন্দারা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানের দিকে চলে যান। কেউ কেউ জঙ্গল বা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এলাকায় আশ্রয় নেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া এবং হামলা অব্যাহত থাকায় কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারা নিজেদের বসতভিটা ধরে রাখতে পারেননি। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তাঁদের অনেকেই এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে নতুন করে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মণিপুরের সংঘাতের অন্যতম মানবিক দিক হলো এ ধরনের সহিংসতার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বারবার ভেঙে পড়া। যেসব পরিবার বছরের পর বছর একটি নির্দিষ্ট গ্রামে বসবাস করেছে, তাদের অনেকেই সংঘাতের সময় কয়েক ঘণ্টার নোটিশে ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, ধর্মীয় স্থাপনা কিংবা স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু তাৎক্ষণিক নিরাপত্তাই নয়, দীর্ঘমেয়াদি জীবিকাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল। একদিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর গতিবিধি, অন্যদিকে জাতিগত উত্তেজনা—দুইয়ের মাঝখানে পড়ে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য ও দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
চার নাগা নাগরিক হত্যার ঘটনায় স্থানীয় নাগা সংগঠনগুলো ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। একটি নাগা সংগঠন প্রতিবাদ হিসেবে ২৪ ঘণ্টার বন্ধের ডাকও দিয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের দাবি, সীমান্তবর্তী নাগা বসতিগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করা এবং সাধারণ মানুষের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
তবে এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কোনো সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষকে সহিংসতার জন্য দায়ী না করা। মণিপুরের মতো দীর্ঘদিন ধরে জাতিগত উত্তেজনায় আক্রান্ত অঞ্চলে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডকে পুরো একটি সম্প্রদায়ের সঙ্গে এক করে দেখলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই হামলাকারীদের পরিচয়, তাদের উদ্দেশ্য এবং ঘটনার পেছনের বাস্তব কারণ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা জরুরি।
সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, মণিপুরে স্থায়ী শান্তির জন্য শুধু তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা, বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সংলাপের পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
পিলংয়ে চার নাগরিকের মৃত্যু তাই কেবল একটি বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সীমান্তবর্তী মানুষের নিরাপত্তা, বাস্তুচ্যুতি, জাতিগত উত্তেজনা এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তির প্রশ্ন। তদন্তে হামলাকারীদের পরিচয় ও দায় নিশ্চিত হওয়া এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার উদ্যোগই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মণিপুরের সাধারণ মানুষ যে শান্তি ও নিরাপত্তার প্রত্যাশায় দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই প্রত্যাশাকে আবারও কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে।