প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কুমিল্লায় স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে। মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনায় এখন থেকে পরিদর্শক পদমর্যাদার একজন পুলিশ কর্মকর্তা তদন্তের দায়িত্ব পালন করবেন। একই সময়ে নিহত অপ্রতিমের পরিবারকে অজ্ঞাত মোবাইল নম্বর থেকে ফোন করে গালাগাল ও হয়রানির অভিযোগ ওঠায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁর বাবা ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার।
পরিবারের দাবি, ছেলেকে হারানোর শোক সামলে ওঠার আগেই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের ফোনে তাদের নতুন করে আতঙ্কের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। একাধিক নম্বর থেকে ফোন আসায় পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পাশাপাশি বিষয়টি গোয়েন্দা পুলিশকেও জানানোর কথা জানিয়েছেন অপ্রতিমের বাবা।
অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান। কুমিল্লার বর্ডার গার্ড হাই স্কুলের সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়। তাকে উদ্ধারে বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালানোর পর সানন্দার একটি নির্জন পাহাড়ি এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মর্মান্তিক এ ঘটনায় পরিবার, সহপাঠী ও পরিচিতজনদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়।
অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজন ‘কেবিজি’ নামের একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। মামলাটির তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফুর রহমান। মামলার শুরুতে সদর দক্ষিণ মডেল থানার এসআই সাইফুল ইসলাম তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন। পরে মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনায় পরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সদর দক্ষিণ থানার এসআই সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, এখন থেকে মামলাটির তদন্ত করবেন থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাজিব আহমেদ। মামলার প্রয়োজনীয় নথিপত্র তাঁর কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। নতুন তদন্ত কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ জানিয়েছেন, পুলিশ সুপার কার্যালয় থেকে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের আদেশ হয়েছে। নথিপত্র হাতে পাওয়ার পর তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হবে এবং দ্রুততম সময়ে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের চেষ্টা করা হবে।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনের স্বীকারোক্তি পাওয়া গেছে। তবে তাঁদের স্বীকারোক্তির বাইরে এই ঘটনায় আর কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ফলে মামলার তদন্তে নতুন কর্মকর্তা দায়িত্ব নেওয়ার পর সাক্ষ্য, জিজ্ঞাসাবাদ, নথিপত্র এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র বের করার চেষ্টা করা হবে।
এদিকে অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার জানিয়েছেন, গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে একটি অজ্ঞাত মোবাইল নম্বর থেকে তাঁকে ফোন করা হয়। ফোনে তাঁর পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। পরিচয় দেওয়ার পর অপর প্রান্তের ব্যক্তি তাঁকে গালাগাল করেন বলে অভিযোগ তাঁর। তিনি ফোন কেটে দেওয়ার পরও একাধিকবার কল আসতে থাকে। পরে নম্বরটি ব্লক করে দিলে অন্য একটি নম্বর থেকেও কল করা হয় বলে জানান তিনি।
ফিরোজ শাহরিয়ারের ভাষ্য, ছেলের হত্যাকাণ্ডের পর পরিবার এমনিতেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এর মধ্যে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন ও গালাগালের ঘটনায় তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, অপ্রতিমের মৃত্যুর কারণ নিয়ে পরিবারও নানা প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তদন্তের মাধ্যমে তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, অপ্রতিমের মৃত্যুর পর গণমাধ্যমকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষীসহ বিভিন্ন মানুষ তাঁদের বাড়িতে আসছেন। তাঁদের অনেককে পরিবার ব্যক্তিগতভাবে চেনে না। ফলে শোকের এই সময়ে বাড়িতে অপরিচিত মানুষের নিয়মিত যাতায়াত নিয়েও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তিনি থানায় জিডি করার কথা জানিয়েছেন এবং বিষয়টি গোয়েন্দা পুলিশকেও জানানোর কথা বলেছেন।
তবে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রকিবুল ইসলাম জানিয়েছেন, ওই সময় পর্যন্ত থানায় এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। ফলে পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা জিডি করা হলে বিষয়টি তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্তের পাশাপাশি কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানও জোরদার হয়েছে। গত বুধবার জেলার বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত অভিযানে এক রাতে ৬২৪ জনকে আটক করার তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। পরে ৪৫১ জনকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্যদের মধ্যে ১৭৩ জনকে মাদক সেবন, নিয়মিত মামলা এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততাসহ বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
কিশোর অপরাধ ও গ্যাং-সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্ত বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। একটি কিশোরের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনকেই থামিয়ে দেয় না, তার সহপাঠী, শিক্ষক, স্বজন ও পরিচিতদের মধ্যেও দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক ও শোক তৈরি করে। তাই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কিশোরদের অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়া ঠেকানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে কুমিল্লা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ২৪ ঘণ্টায় ৯৮টি মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার তথ্য জানানো হয়েছে। এসব অভিযানে ১৮৫ কেজি গাঁজা, ৩৩৯টি ইয়াবা এবং ৭২ বোতল ইস্কাফ সিরাপ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। অভিযানে ২২ জন কথিত মাদক ব্যবসায়ী ও ৭৪ জন মাদকসেবীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিভিন্ন মামলায় আরও ১৬৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এসব বৃহত্তর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও গুরুত্ব পেতে পারে। বিশেষ করে কিশোরদের অপরাধে সম্পৃক্ত হওয়ার পেছনে মাদক, সংঘবদ্ধতা কিংবা অপরাধচক্রের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তদন্তে তা স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে দেওয়া সম্ভব নয়।
অপ্রতিমের পরিবার এখন একদিকে সন্তানের মৃত্যুর শোক বহন করছে, অন্যদিকে মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। পরিবারের প্রত্যাশা, তদন্ত দ্রুত এগিয়ে নিয়ে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের ফলে মামলাটি নতুন করে আরও বিস্তৃতভাবে পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন তদন্তের পরবর্তী ধাপে কী তথ্য বেরিয়ে আসে এবং অপ্রতিম হত্যার সঙ্গে আর কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিই দেখার বিষয়। একই সঙ্গে পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে ওঠা অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। একটি মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ন্যায়সংগত তদন্তের পাশাপাশি শোকাহত পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।