এলএনজি ভর্তুকিতে আড়াই মাসেই ১০ হাজার কোটি টাকা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
এলএনজি ভর্তুকিতে আড়াই মাসেই ১০ হাজার কোটি টাকা

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলতি অর্থবছরের শুরুতেই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানিতে সরকারের আর্থিক চাপ দ্রুত বেড়ে গেছে। অর্থবছরের প্রথম আড়াই মাসেই এই খাতে প্রায় ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। অথচ পুরো অর্থবছরের জন্য এলএনজি খাতে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ নির্ধারিত পুরো বছরের বরাদ্দের তুলনায় আড়াই মাসেই অতিরিক্ত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে সরকারকে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলায় স্পট মার্কেট থেকে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থায়। এলএনজি আমদানির ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তাও দ্রুত বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমান মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে মোট ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপও কয়েক গুণ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি খাতে এরই মধ্যে যে আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে এলএনজির বাড়তি ব্যয় যুক্ত হওয়ায় সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

পেট্রোবাংলার হিসাবে, গত সাড়ে ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে এলএনজি খাতে অতিরিক্ত প্রায় ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। সংস্থাটির পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, যুদ্ধের প্রভাবে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে এই অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। একই সময়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম আড়াই মাসে এলএনজির জন্য প্রায় ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় এলএনজির গুরুত্ব দিন দিন বেড়েছে। দেশে উৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাসের পাশাপাশি আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য খাতে গ্যাস সরবরাহে ভূমিকা রাখে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে গেলে শুধু আমদানি ব্যয়ই বাড়ে না, এর প্রভাব দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় এবং সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থার ওপরও পড়ে।

বাংলাদেশ এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেটের ওপরও নির্ভরশীল। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কেনা হয়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় এই নির্ভরতা এখন সরকারের জন্য বাড়তি ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চলতি বছরের শুরুতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি প্রায় ১০ থেকে ১২ ডলারে কেনা হলেও সেপ্টেম্বরে এর দাম প্রায় ৩০ ডলারে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে একই পরিমাণ এলএনজি কিনতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পরিবহন, সরবরাহ এবং অন্যান্য আমদানি-সংশ্লিষ্ট ব্যয় যুক্ত হওয়ায় সরকারের ওপর সামগ্রিক আর্থিক চাপ আরও বাড়ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারকে বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কিছু সরবরাহকারী ফোর্স মেজর ঘোষণা করায় বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের প্রয়োজন হয়েছে। মানুষের দুর্ভোগ কমানো এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে বাড়তি ব্যয় সত্ত্বেও সরকার এই ঝুঁকি নিচ্ছে বলে তিনি জানান।

এলএনজির পাশাপাশি জ্বালানি তেলেও সরকারের আর্থিক চাপ কমছে না। গত সাড়ে ছয় মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি জাহাজভাড়া, প্রিমিয়াম ও অন্যান্য আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রীয় সংস্থাটির ওপর লোকসানের চাপ তৈরি হয়েছে।

গত ২০ সেপ্টেম্বর দেশে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হলেও ডিজেলে এখনো প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা লোকসান হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি লিটার ডিজেলের ব্যয় প্রায় ২০৫ টাকা হলেও নতুন মূল্য সমন্বয়ের পর দেশে তা ১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে দেশের খুচরা বিক্রয়মূল্যের বড় ব্যবধান থেকেই যাচ্ছে।

বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, গত সাড়ে ছয় মাসে সংস্থাটির মাসিক গড় লোকসান প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের পরও এই লোকসানের পুরোটা সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বিপিসির লোকসানের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কাভার হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের আগে কয়েক মাস মূল্য অপরিবর্তিত রাখার কারণেও বিপিসির লোকসান বেড়েছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত মূল্য সমন্বয় না করায় বিপিসির লোকসান ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে জানানো হয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম এবং আমদানি ব্যয় বাড়তে থাকায় দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি বিক্রির ফলে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটিকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি বহন করতে হয়েছে।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতেও জ্বালানি ব্যয়ের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। সম্প্রতি ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি কয়লার দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামগ্রিক ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা লোকসানের হিসাব ধরা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বেড়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। গ্যাসের ঘাটতি পূরণে ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহার, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের মূল্যবৃদ্ধি এবং অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় একত্রে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

জ্বালানি খাতের এই ধারাবাহিক ব্যয় বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনা ও ভর্তুকি কাঠামোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এলএনজি, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ—তিনটি খাতেই যদি আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চমূল্য ও সরবরাহ সংকট অব্যাহত থাকে, তাহলে রাষ্ট্রীয় অর্থ থেকে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হতে পারে। এর ফলে অন্যান্য উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক খাতে অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপরও পরোক্ষ চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে স্বল্পমেয়াদে সরকারের জন্য ভর্তুকি ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার লোকসান সামলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে। পরিবহন ও কৃষিতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো এবং সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক ব্যবস্থা সম্প্রসারণের মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমানোর সুযোগ রয়েছে বলে তারা মনে করছেন।

বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু এলএনজি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধির বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের জ্বালানি সরবরাহ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা এবং সরকারের ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার বিষয়ও সরাসরি যুক্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তার ওপর আগামী মাসগুলোতে সরকারের জ্বালানি ব্যয়ের বড় অংশ নির্ভর করবে। এরই মধ্যে আড়াই মাসে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকার এলএনজি ভর্তুকি সরকারের জন্য সেই চাপের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত