৩১ জানুয়ারির মধ্যে সব হাট-বাজারে সৌরবিদ্যুৎ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
৩১ জানুয়ারির মধ্যে সব হাট-বাজারে সৌরবিদ্যুৎ

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের প্রতিটি উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের হাট ও বাজারে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ২০২৭ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে এসব স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা বাজারের নিজস্ব চাহিদা পূরণ শেষে যে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ অবশিষ্ট থাকবে, তা নেট মিটারিং পদ্ধতিতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার ব্যবস্থা রাখতে বলা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের এ উদ্যোগকে দেশের প্রত্যন্ত ও স্থানীয় পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে হাট-বাজারের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ সৌরশক্তির মাধ্যমে পূরণের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বাড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের উপজেলা-২ শাখা থেকে এ বিষয়ে একটি নির্দেশনা জারি করা হয়। নির্দেশনাটি দেশের সব উপজেলা পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। সেখানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ এবং প্রতিটি উপজেলার আওতাধীন হাট ও বাজারে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

নির্দেশনায় দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থায় নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সরকারি উদ্যোগের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন দপ্তর, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থানীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিদ্যমান দাপ্তরিক ভবন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ভবনের ছাদেও ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এসব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ন্যূনতম দুই ঘণ্টার ব্যাটারি ব্যাকআপ রাখার বিষয়টিও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেলে বা সাময়িকভাবে গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঞ্চিত শক্তি ব্যবহার করার সুযোগ থাকবে। বিশেষ করে উপজেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের সরকারি স্থাপনায় এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে জরুরি সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

সরকারি নির্দেশনায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের পর অব্যবহৃত বিদ্যুৎ নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নেট মিটারিং নির্দেশিকা, ২০২৫ অনুযায়ী জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের বিপরীতে ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে অর্থ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এই ব্যবস্থার ফলে সৌরবিদ্যুৎকে শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মাধ্যম হিসেবে নয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সম্ভাব্য আয়ের উৎস হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে। দিনের বেলায় সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ যদি সংশ্লিষ্ট বাজার, ভবন বা স্থাপনার প্রয়োজন মেটানোর পর অবশিষ্ট থাকে, তাহলে সেটি গ্রিডে সরবরাহের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

হাট ও বাজারে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের অর্থায়নের ক্ষেত্রেও নির্দেশনায় একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তুলে ধরা হয়েছে। হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) বিধিমালা, ২০২৫-এর বিধি ১০-এর উপবিধি (৩) ও (৫) অনুযায়ী হাট ও বাজারের ইজারালব্ধ আয় থেকে নির্ধারিত অর্থ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যবহার করা যাবে। অর্থাৎ নতুন করে সম্পূর্ণ অর্থের সংস্থান না করে সংশ্লিষ্ট হাট-বাজার থেকে অর্জিত নির্ধারিত রাজস্বের একটি অংশ ব্যবহার করে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট হাট ও বাজারের রক্ষণাবেক্ষণ বা উন্নয়নের জন্য নির্ধারিত ইজারালব্ধ আয়ের ১০ শতাংশ এবং উপজেলার আওতাধীন হাট ও বাজারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ বা উন্নয়নের জন্য নির্ধারিত আরও ১০ শতাংশ অর্থ থেকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া যাবে। ফলে বাজার ব্যবস্থাপনার বিদ্যমান আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থাকে যুক্ত করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।

দেশের অনেক হাট ও বাজারে স্থায়ী শেড, দোকানপাট, সরকারি বা আধা-সরকারি স্থাপনা এবং বহুতল ভবনের বড় ছাদ রয়েছে। এসব ছাদ সাধারণত দিনের বড় একটি সময় সূর্যের আলো পেয়ে থাকে। নির্দেশনায় এই বাস্তবতাকে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উপজেলার প্রতিটি হাট ও বাজারের স্থায়ী শেডের ছাদ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন বাজারে নির্মিত চার থেকে পাঁচতলা ভবনের ছাদের আয়তন বিবেচনা করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

এ ধরনের স্থাপনা ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণ বা বড় পরিসরে অতিরিক্ত জায়গা ব্যবহারের প্রয়োজন কমতে পারে। একই সঙ্গে বাজার এলাকায় দিনের বেলায় বিদ্যুতের চাহিদার একটি অংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। বাজারের আলো, বিভিন্ন সরকারি বা ব্যবস্থাপনা কার্যালয় এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহারে এর সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করাই পুরো উদ্যোগের শেষ ধাপ নয়। স্থাপিত প্যানেল, ব্যাটারি ও অন্যান্য সরঞ্জামের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরবর্তী ২০ বছর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, ত্রুটি নিরসন এবং কার্যকারিতা বজায় রাখার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশের বিপুলসংখ্যক হাট-বাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানি, ক্রেতা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এসব বাজারের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্নতা ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা বাজার পরিচালনা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে এসব স্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা শক্তিশালী হতে পারে।

একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টায় স্থানীয় পর্যায় থেকেও অবদান রাখা সম্ভব হবে। বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাজারগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিস্তার হলে সাধারণ মানুষের কাছেও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে।

স্থানীয় সরকার বিভাগ জানিয়েছে, হাট ও বাজারে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটবে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্ব আয় বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।

এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলার প্রতিটি হাট ও বাজারে এ নির্দেশনা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হয়, সেটিই হবে মূল বিষয়। কোথায় কতটুকু ছাদ রয়েছে, কী পরিমাণ সৌর প্যানেল প্রয়োজন, ব্যাটারি ব্যাকআপের সক্ষমতা কত হবে এবং উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কীভাবে গ্রিডে যুক্ত করা হবে—এসব বিষয় বাস্তবায়নের পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে দীর্ঘ ২০ বছরের রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং প্রকল্পের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাও উদ্যোগটির স্থায়িত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে ৩১ জানুয়ারি ২০২৭-এর সময়সীমাকে সামনে রেখে দেশের হাট-বাজারগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর একটি বড় কর্মসূচি হিসেবে সামনে এসেছে। পরিকল্পনাটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে বাজারের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থার প্রসারেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত