প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরে ৩০ কর্মসূচি, ১১ দেশের সঙ্গে বৈঠক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরে ৩০ কর্মসূচি, ১১ দেশের সঙ্গে বৈঠক

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের নিউইয়র্ক সফর শেষ হয়েছে নানা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ও কূটনৈতিক বৈঠকের মধ্য দিয়ে। সফরকালে ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এসব বৈঠক ও আয়োজনে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক শান্তির মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

শুক্রবার রাতে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চার দিনের সফরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ-সংশ্লিষ্ট আটটি কর্মসূচি, জাতিসংঘের সাইডলাইনে চারটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান, ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে আরও কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে সরাসরি আলোচনা। প্রধানমন্ত্রী এসব বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো, জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ জোরদার, জনশক্তি রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরির বিষয় তুলে ধরেছেন বলে মাহদী আমিন জানান।

নিউইয়র্ক সফরের একটি উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি ছিল ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক। বৃহস্পতিবার সকালে জেপি মরগান চেজের আয়োজনে অনুষ্ঠিত প্রাতরাশ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেন। সেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ, বিদ্যমান বিনিয়োগ পরিবেশ এবং ভবিষ্যতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এ ধরনের যোগাযোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তুলে ধরার পাশাপাশি বিদেশি পুঁজি আকর্ষণের ক্ষেত্রে নতুন আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

এরপর প্রধানমন্ত্রী ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসা এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র জানান। একই দিনে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মানবাধিকার, আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতার বিষয়টিও সফরে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপ-প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। এসব আলোচনায় বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা, আরও জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ খাতে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয় উঠে আসে।

মাহদী আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনটি দেশই প্রধানমন্ত্রীকে নিজ নিজ দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এ আমন্ত্রণকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও সক্রিয় করার একটি সম্ভাব্য সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও জনশক্তিভিত্তিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের হওয়ায় কর্মসংস্থান, রেমিট্যান্স, জ্বালানি ও বিনিয়োগের মতো বিষয়গুলো দুই পক্ষের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রধানমন্ত্রীর চার দিনের কর্মসূচির মধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ-সংশ্লিষ্ট আটটি অনুষ্ঠানের পাঁচটিতে তিনি বক্তব্য দিয়েছেন। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘের মহাসচিব, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হাইকমিশনার এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

এসব বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করায় এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। একই সঙ্গে মিয়ানমার পরিস্থিতি, শরণার্থী প্রত্যাবাসন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাও বৃহত্তর কূটনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের আয়োজনে রোহিঙ্গা সংকট এবং মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য ও মিডওয়াইফারি নিয়ে দুটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর বাইরে জলবায়ু পরিবর্তন, জাস্ট ট্রানজিশন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ নিয়েও প্রধানমন্ত্রী উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যু। উপকূলীয় অঞ্চল, নদীভাঙন, লবণাক্ততা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে জাতিসংঘের মতো বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে এসব বিষয় তুলে ধরার মাধ্যমে বাংলাদেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক আলোচনায় উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানও সফরে বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে অংশ নেন। মাহদী আমিন জানান, তিনি আটটি উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে চারটিতে বক্তব্য দিয়েছেন। এর মধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্ল্যাটফর্ম অব উইমেন লিডার্স, ফার্স্ট স্পাউসেস ডায়ালগ এবং মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য ও মিডওয়াইফারি-সংক্রান্ত অনুষ্ঠান উল্লেখযোগ্য। এসব কর্মসূচিতে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা তাঁর বক্তব্যের প্রশংসা করেছেন বলেও তিনি জানান।

চার দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা প্রায় ৮০টি বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নিজের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল ৩০টি। একটি তুলনামূলক ছোট প্রতিনিধিদল নিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে এতগুলো কর্মসূচি সম্পন্ন করার বিষয়টিকেও সফরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

মাহদী আমিন বলেন, সফরের প্রতিটি কর্মসূচিতে বাংলাদেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ সময় পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকারের পাশাপাশি বিশ্বশান্তি, মানবতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয় উঠে এসেছে।

তবে আন্তর্জাতিক সফরের বাস্তব মূল্যায়ন শুধু কর্মসূচির সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আলোচিত বিষয়গুলো পরবর্তী সময়ে কতটা বাস্তব অগ্রগতি পায়, বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর হয়, জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ কতটা তৈরি হয় এবং রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ু ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কতটা বাড়ে—এসব বিষয়ই শেষ পর্যন্ত সফরের দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

নিউইয়র্ক সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের বেশ কিছু বিষয় একই সময়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে সরকার। একদিকে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য, অন্যদিকে জনশক্তি, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা—এসবের পাশাপাশি মানবিক সংকট, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু ইস্যুও আলোচনায় এসেছে। ফলে চার দিনের সফরটি বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয়—দুই ধরনের কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেই ব্যস্ত ছিল।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর, শামা ওবায়েদ, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মর্তুজা, জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপস্থায়ী প্রতিনিধি এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান এবং প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনিসহ প্রেস উইংয়ের সদস্যরা ছিলেন।

নিউইয়র্কের ব্যস্ত কূটনৈতিক পরিসরে অনুষ্ঠিত বৈঠক ও কর্মসূচিগুলোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় অগ্রাধিকার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন এসব আলোচনার ধারাবাহিকতা কতটা কার্যকর সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনে রূপ নেয়, সেটিই হবে সফরের পরবর্তী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত