প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যের ঘোষিত ধারাবাহিক লংমার্চ কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়ানোর প্রস্তাব উঠেছে। পূর্বঘোষিত চট্টগ্রাম ও রংপুরের পর খুলনা ও সিলেট বিভাগে কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতির মধ্যেই রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগে নতুন করে লংমার্চ করার প্রস্তাব এসেছে। স্থানীয় নেতাদের পক্ষ থেকে দেওয়া এসব প্রস্তাব নিয়ে জোটের লিয়াজোঁ কমিটি ও শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
১১–দলীয় ঐক্যের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগে লংমার্চের প্রস্তাবটি পরবর্তী লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা হতে পারে। বৈঠকের দিনক্ষণ এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে নতুন দুই বিভাগের কর্মসূচির পাশাপাশি সামনে থাকা খুলনা ও সিলেটের লংমার্চ নিয়েও প্রস্তুতি ও বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
জোটের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ৩১ অক্টোবর খুলনা বিভাগ এবং ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে লংমার্চ করার কথা রয়েছে। এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এবং ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে দুটি লংমার্চ কর্মসূচি পালন করেছে ১১–দলীয় ঐক্য। ফলে ধারাবাহিক কর্মসূচির পরবর্তী ধাপে খুলনা ও সিলেটকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে সিলেটের কর্মসূচির ধরন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর আগে সড়কপথের পরিবর্তে ট্রেনযোগে সিলেট অভিমুখে লংমার্চ করার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছিল। এখন সেই সিদ্ধান্তও পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ট্রেনে একই সময়ে সাধারণ যাত্রী পরিবহন চালু থাকার কারণে কর্মসূচি বাস্তবায়নের সময় কোনো ধরনের জটিলতা বা জনভোগান্তি তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে জোটের মধ্যে আলোচনা চলছে।
১১–দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন, সিলেট বিভাগের সড়ক যোগাযোগের পরিস্থিতি বিবেচনা করেই ট্রেনপথে লংমার্চের চিন্তা করা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রেলস্টেশনের কাছাকাছি এলাকায় পথসভা আয়োজনের প্রস্তাবও রয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি তুলনামূলকভাবে কম রাখা যায়। তবে একই সময়ে সাধারণ যাত্রীদের জন্য ট্রেন চলাচল অব্যাহত থাকায় কর্মসূচির বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো সমস্যা তৈরি হবে কি না, সেটি শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে পর্যালোচনা করা হবে।
সিলেটের কর্মসূচি নিয়ে এই পর্যালোচনা রাজনৈতিক কর্মসূচি ও জনজীবনের স্বাভাবিক চলাচলের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টিকেও সামনে এনেছে। বড় ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ হলে পরিবহনব্যবস্থা, সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং স্থানীয় জনজীবনে প্রভাব পড়তে পারে। সে কারণে কর্মসূচির রুট, সমাবেশস্থল এবং যাতায়াতব্যবস্থা নিয়ে আগাম পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
এদিকে ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের মধ্য দিয়ে ১১–দলীয় ঐক্য তাদের ধারাবাহিক কর্মসূচি শুরু করে। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে দ্বিতীয় লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। জোটের ঘোষিত কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল জাতীয় রাজনৈতিক দাবিগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে তুলে ধরা এবং একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা।
চট্টগ্রামের লংমার্চে জোটের পক্ষ থেকে কয়েকটি জাতীয় দাবি সামনে আনা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবি। পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি, দখলবাজি ও চাঁদাবাজি বন্ধের বিষয়ও দাবির সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
রংপুরের কর্মসূচিতেও জাতীয় দাবির পাশাপাশি স্থানীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে আনা হয়। উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি লংমার্চের কর্মসূচিতে যুক্ত করা হয়। জোটের নেতাদের ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবিগুলোও সামনে আনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে রাজশাহী ও বরিশালে নতুন লংমার্চ হলে সেখানকার আঞ্চলিক ইস্যুগুলোও কর্মসূচিতে যুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জোটের নেতারা চট্টগ্রাম ও রংপুরের লংমার্চকে সফল কর্মসূচি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের দাবি, দুটি কর্মসূচিতেই দলীয় নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। ১১–দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদও এসব কর্মসূচিতে মানুষের অংশগ্রহণের কথা তুলে ধরে বলেছেন, এর মাধ্যমে জনগণের বিভিন্ন দাবির বিষয় সরকারের কাছে পৌঁছেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে জোট তাদের রাজনৈতিক দাবিগুলো আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরতে চায়।
তবে রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশগ্রহণ ও প্রভাব নিয়ে জোটের নেতাদের বক্তব্য তাঁদের নিজস্ব মূল্যায়ন। এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের প্রকৃত পরিমাণ, সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা এবং কর্মসূচির রাজনৈতিক প্রভাব নির্ধারণে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে। একইভাবে কর্মসূচিকে ঘিরে জনভোগান্তি বা যোগাযোগব্যবস্থায় প্রভাব পড়ার বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
১১–দলীয় ঐক্যের নেতারা বলছেন, লংমার্চের মাধ্যমে জাতীয় দাবিগুলোকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক ইস্যুগুলোকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আনা হচ্ছে। তাঁদের ভাষ্য, ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে জুলাই সনদ অনুযায়ী সংস্কারের দাবিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয় মাঠপর্যায়ে আরও বিস্তৃত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারকে এসব দাবির বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরির লক্ষ্যও রয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ময়মনসিংহ বিভাগে আলাদা লংমার্চ করার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ১১–দলীয় ঐক্যের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকার সঙ্গে ময়মনসিংহের দূরত্ব তুলনামূলক কম হওয়ায় এবং অন্যান্য বিভাগের লংমার্চের রুটের সঙ্গে ময়মনসিংহের কিছু অংশ যুক্ত থাকায় আলাদা কর্মসূচির প্রয়োজন তারা এখনো দেখছেন না।
চার বিভাগে ঘোষিত কর্মসূচির পাশাপাশি রাজশাহী ও বরিশালে নতুন লংমার্চের প্রস্তাব সামনে আসায় ১১–দলীয় ঐক্যের কর্মসূচির পরিধি নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে প্রস্তাব দুটি এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে রূপ নেয়নি। ফলে রাজশাহী ও বরিশালে শেষ পর্যন্ত লংমার্চ হবে কি না, তা নির্ভর করছে জোটের লিয়াজোঁ কমিটি ও শীর্ষ নেতাদের পরবর্তী বৈঠকের সিদ্ধান্তের ওপর।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সামনে থাকা খুলনা ও সিলেটের কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তুতিও একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সিলেটে ট্রেনপথে লংমার্চের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে সাধারণ যাত্রীদের চলাচল এবং কর্মসূচির অংশগ্রহণকারীদের ব্যবস্থাপনা কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। এ কারণে সিলেটের কর্মসূচির ধরন চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট সব দিক বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিভাগভিত্তিক লংমার্চ শেষে ঢাকায় বড় ধরনের সমাবেশ করার পরিকল্পনাও ১১–দলীয় ঐক্যের রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, এই মহাসমাবেশের সময়সূচি পরিবর্তিত হয়ে ডিসেম্বরের দিকে যেতে পারে। তবে সেটিও এখনো চূড়ান্ত নয়। রাজশাহী ও বরিশালের প্রস্তাব, সিলেটের কর্মসূচির ধরন এবং পরবর্তী মহাসমাবেশের সময়সূচি—সব মিলিয়ে আগামী বৈঠকগুলোতেই জোটের পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচির রূপরেখা আরও স্পষ্ট হতে পারে।