হরমুজ খুলতে ইরানের সাত দিনের প্রস্তাব, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৫ বার
হরমুজ খুলতে ইরানের সাত দিনের প্রস্তাব, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের নতুন একটি উদ্যোগ সামনে এনেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করলে সাত দিনের মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করার প্রস্তাবও দিয়েছে তেহরান।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে অবস্থানরত আরাগচি সাংবাদিকদের বলেছেন, কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে সাত দিনের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা পাঠানো হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে এই সময়ের মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল শুরু করা যেতে পারে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এখন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।

ইরানের প্রস্তাবটি শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ খুলে দেওয়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানি, মার্কিন নৌ অবরোধ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে তা শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেই নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।

আরাগচির বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে যেসব পদক্ষেপ নিতে হবে, সেগুলোর বড় অংশ আগেই দুই পক্ষের মধ্যে আলোচিত সমঝোতা স্মারকে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নতুন কোনো অজানা শর্ত তৈরি করা হয়নি; বরং আগের আলোচনার কাঠামোর ভিত্তিতেই নতুন করে কূটনৈতিক পথ খোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ইরানের প্রস্তাবের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া, ইরানি তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহার করা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে স্থগিত আলোচনা পুনরায় শুরু করার কথাও রয়েছে।

আরাগচি জানিয়েছেন, সাত দিনের সময়সীমাটি যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটি গ্রহণ করার পর থেকে কার্যকর হবে। অর্থাৎ ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন সম্মতি দিলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কয়েক দিনের মধ্যে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্বের কারণেই এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা এই জলপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশ পরিবহন হতো। প্রণালিতে নৌ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ফলে হরমুজ পুনরায় স্বাভাবিক হলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে ইরানের প্রস্তাবের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা চলার বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সময়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক অবস্থান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী বক্তব্যও এসেছে। এর ফলে কূটনৈতিক যোগাযোগ থাকলেও দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার ঘাটতি যে এখনো বড় বাধা, সেটি স্পষ্ট।

সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাত দিনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন। তবে এসব তথ্যের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ও পূর্ণাঙ্গ মার্কিন ঘোষণা এখনো স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে ইরানের প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের কাছ থেকে কী প্রতিক্রিয়া পাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এদিকে পারমাণবিক কর্মসূচির প্রশ্নটিও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান হলো, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে না। অন্যদিকে তেহরানের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, শান্তি আলোচনা হলেও নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচির মৌলিক অধিকার নিয়ে তারা ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিষয়টি ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান হিসেবে রয়ে গেছে।

এই জায়গাতেই দুই পক্ষের আলোচনার সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হতে পারে। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া বা সাময়িক যুদ্ধবিরতি নিয়ে সমঝোতা সম্ভব হলেও পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে মতপার্থক্য থেকে যেতে পারে। ফলে সাত দিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অর্থ সরাসরি দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তি হয়ে যাওয়া নয়; বরং এটি বৃহত্তর আলোচনার জন্য একটি নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

ইরান একই সঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গেও হরমুজ প্রণালির নিরাপদ নৌ চলাচল নিয়ে যোগাযোগ করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে আরাগচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন বলে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এই যোগাযোগ আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের ভূমিকাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

হরমুজ সংকটের সঙ্গে ইয়েমেনের হুতি হামলার বিষয়টিও যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সাম্প্রতিক সময়ে রিয়াদের দিকে যাওয়া হুতিদের ড্রোন এবং সৌদি ভূখণ্ডের দিকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে। এর ফলে হরমুজের পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব নৌপথ নিয়েও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের উদ্বেগ বেড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই বিস্তৃত সংঘাত ইতোমধ্যে বহু মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করেছে। যুদ্ধ ও সামরিক হামলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি এবং সাধারণ মানুষের বাস্তুচ্যুতির মতো বিষয়গুলোও সামনে এসেছে। তাই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া শুধু তেল পরিবহনের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে যুদ্ধকবলিত অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাও জড়িয়ে আছে।

ইরানের সাত দিনের পরিকল্পনা এখন কূটনৈতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তেহরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র আন্তরিক হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার অবস্থানও রয়েছে। ফলে আগামী কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনার অগ্রগতি বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

সবশেষে, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলেও ইরানের নতুন প্রস্তাব অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যেও কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এখন সেই যোগাযোগ বাস্তব যুদ্ধবিরতি, নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনার স্থায়ী কাঠামো তৈরি করতে পারে কি না, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত