ডিআর কঙ্গোয় নতুন দুই এলাকায় ছড়াল ইবোলা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৮ বার
ডিআর কঙ্গোয় নতুন দুই এলাকায় ছড়াল ইবোলা

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোতে (ডিআর কঙ্গো) ইবোলা ভাইরাসের চলমান প্রাদুর্ভাব আরও বিস্তৃত হচ্ছে। নতুন করে দুটি স্বাস্থ্য এলাকায় রোগী শনাক্ত হওয়ায় দেশটিতে আক্রান্ত স্বাস্থ্য অঞ্চলের সংখ্যা বেড়ে ৬৩টিতে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের সংঘাত, মানুষের বাস্তুচ্যুতি, দুর্গম এলাকায় যাতায়াতের সংকট এবং রোগীদের চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে অনীহার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিআর কঙ্গোয় ইবোলায় মোট ৭ হাজার ৮৯০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩ হাজার ৭৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ শনাক্ত রোগীদের প্রায় অর্ধেকই প্রাণ হারিয়েছেন। চলমান প্রাদুর্ভাবের ভয়াবহতা বোঝাতে এই মৃত্যুর পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। তবে স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্বেগের বড় কারণ শুধু মৃত্যুর সংখ্যা নয়, বরং ভাইরাসটি নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা।

সম্প্রতি দক্ষিণ উবাঙ্গি গভর্নরেটের বুলু এবং ওত-উয়েলে প্রদেশের দুঙ্গু এলাকায় নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। দুটি এলাকাই সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সীমান্ত পেরিয়ে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানো নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সংঘাতপ্রবণ এলাকায় মানুষের চলাচল অনিয়মিত হওয়ায় কারা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়াসুস জানিয়েছেন, সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতির কারণে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো এবং সম্ভাব্য সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করার কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছেন। এর ফলে স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য রোগীর গতিবিধি অনুসরণ করা এবং সংক্রমণের সম্ভাব্য চেইন চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে উঠছে।

ইবোলা মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষদের দ্রুত শনাক্ত করা। তাদের পর্যবেক্ষণে রেখে উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে সংক্রমণের বিস্তার কমানো সম্ভব। কিন্তু ডিআর কঙ্গোয় সম্ভাব্য সংস্পর্শে আসা মানুষের তুলনায় শনাক্ত ও তালিকাভুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা এখনো অনেক কম।

আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের মহাপরিচালক জ্যাঁ কাসেইয়ার তথ্য অনুযায়ী, সাত হাজারের বেশি নিশ্চিত আক্রান্ত রোগীর ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, তাদের সংস্পর্শে আসা মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার হতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার ব্যক্তিকে শনাক্ত করে তালিকাভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এই ব্যবধানই স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সামনে থাকা বড় সমস্যার একটি দিক তুলে ধরছে।

চলমান প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ডিআর কঙ্গোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইতুরি প্রদেশ। মে মাসে প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে সেখানে ৬ হাজার ৩২ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সাম্প্রতিক ২১ দিনেই নতুন করে ৮৬৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন। অর্থাৎ প্রদেশটিতে ভাইরাসের সংক্রমণ এখনো সক্রিয় এবং দ্রুতগতিতে নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে।

এরপর সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে উত্তর কিভু প্রদেশ। সেখানে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৪৮০ জন। সাম্প্রতিক ২১ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ৫৬৭ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি শনাক্ত হওয়া আক্রান্ত ও মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উত্তর কিভু প্রদেশেই ঘটছে। সেখানে শনাক্ত রোগীদের প্রায় ৬০ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে, যা ডিআর কঙ্গোর জাতীয় গড় মৃত্যুহারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

উত্তর কিভুর পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলেছে মানুষের মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে ভয় ও অনাস্থা। স্বাস্থ্যকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক রোগী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার আগে চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে চান না। ফলে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হয় এবং চিকিৎসা শুরু করার সময় রোগীর অবস্থা অনেক বেশি জটিল হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তি যদি চিকিৎসা নেওয়ার আগে অন্য মানুষের সংস্পর্শে আসেন, তাহলে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ে।

উত্তর কিভুর বুটেম্বো এলাকার একটি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক মিশেল পালুকু মুকুলোলি জানিয়েছেন, অনেক রোগীর ধারণা, হাসপাতালে গেলে তাদের সরাসরি ইবোলা চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো হবে এবং সেখানে তাদের মৃত্যু হবে। এই ভয় তাদের চিকিৎসা নেওয়া থেকে দূরে রাখছে। ফলে রোগীরা অনেক সময় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই গুরুতর অবস্থায় চলে যাচ্ছেন।

ইবোলার মতো প্রাণঘাতী সংক্রমণের ক্ষেত্রে এই ধরনের ভয় ও ভুল ধারণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের সুযোগ বাড়ে। কিন্তু মানুষ যদি সামাজিক ভয়, আতঙ্ক বা ভুল ধারণার কারণে স্বাস্থ্যকেন্দ্র এড়িয়ে চলে, তাহলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা এবং তার সংস্পর্শে আসা মানুষদের খুঁজে বের করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

বর্তমান প্রাদুর্ভাবের আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো ভাইরাসটির ধরন। এবার ডিআর কঙ্গোয় বুন্দিবুগিও স্ট্রেইনের ইবোলা শনাক্ত হয়েছে। এই স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে এখনো কোনো অনুমোদিত টিকা নেই। ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা, দ্রুত শনাক্তকরণ, আক্রান্তদের চিকিৎসা এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।

ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, ইবোলার টিকা ও চিকিৎসা নিয়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে গবেষণা ও পরীক্ষার ফল হাতে আসতে সময় প্রয়োজন। এর মধ্যে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের প্রধান ভরসা হয়ে আছে।

উত্তর কিভুতে ইবোলার প্রাদুর্ভাব নতুন নয়। এর আগে সেখানে তিনবার সংক্রমণ ছড়িয়েছিল। বিশেষ করে ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রাদুর্ভাবটি ছিল ডিআর কঙ্গোর সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী ইবোলা সংকটগুলোর একটি। তবে সেই সময়ের প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ছিল ইবোলা ভাইরাসের জায়ার স্ট্রেইন। বর্তমান পরিস্থিতিতে বুন্দিবুগিও স্ট্রেইনের বিস্তার নতুন কিছু স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ সামনে এনেছে।

স্বাস্থ্যকর্মীদের মতে, সংক্রমণের শুরুতে বুন্দিবুগিও স্ট্রেইনে আক্রান্ত অনেক রোগীর উপসর্গ তুলনামূলকভাবে মৃদু থাকতে পারে। জ্বর, দুর্বলতা বা অন্যান্য সাধারণ উপসর্গকে ম্যালেরিয়া কিংবা টাইফয়েডের মতো প্রচলিত রোগের লক্ষণ বলে মনে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে রোগী যেমন দ্রুত ইবোলা শনাক্তের আওতায় আসতে পারেন না, তেমনি চিকিৎসকরাও প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি শনাক্ত করতে অতিরিক্ত সতর্কতার প্রয়োজন অনুভব করেন।

সব মিলিয়ে ডিআর কঙ্গোর ইবোলা পরিস্থিতি এখন শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে নিরাপত্তা, বাস্তুচ্যুতি, সীমান্তবর্তী মানুষের চলাচল এবং চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর আস্থার প্রশ্ন। নতুন দুটি এলাকায় সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় ভাইরাসের ভৌগোলিক বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

তবে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখন আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা, তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কের পরিবর্তে সচেতনতা তৈরি করা। সংঘাতপূর্ণ ও দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদে পৌঁছানোর সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে সংক্রমণের চেইন ভাঙার সম্ভাবনাও বাড়বে।

ডিআর কঙ্গোর বর্তমান পরিস্থিতি তাই আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর জন্যও বড় পরীক্ষা। ভাইরাসের বিস্তার যত নতুন এলাকায় পৌঁছাবে, নিয়ন্ত্রণের কাজ তত কঠিন হবে। আর সময়মতো শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে মৃত্যুহার আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকবে। মানুষের ভয় কমিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দ্রুত যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করা এবং আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের কার্যকরভাবে শনাক্ত করাই এখন এই প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত