আদানি-আইপিপি নির্ভরতায় বিদ্যুৎ খাতে ব্যয়ের চাপ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৮ বার
আদানি-আইপিপি নির্ভরতায় বিদ্যুৎ খাতে ব্যয়ের চাপ

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, আমদানিনির্ভরতা, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এবং বিশেষ করে ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি নিয়ে আবারও আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশে স্থাপিত অনেক বেসরকারি কেন্দ্রের জন্য সক্ষমতা বাবদ অর্থ পরিশোধ, জ্বালানি সংকট এবং আমদানি ব্যয়—সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ। একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা সরকারের সঙ্গে যে চুক্তিতে গেছে, তার শর্ত অনুযায়ীই অর্থ পেয়ে থাকে এবং ক্যাপাসিটি পেমেন্ট কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ, জ্বালানি সংগ্রহ এবং উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা বেশি থাকা, জ্বালানি সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপের কারণে অনেক সময় কেন্দ্রগুলোর পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ না কিনলেও নির্দিষ্ট চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্রের সক্ষমতার জন্য যে অর্থ দিতে হয়, সেটিই ক্যাপাসিটি পেমেন্ট হিসেবে পরিচিত।

২০২৬ সালের বিভিন্ন তথ্য ও বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি পেমেন্টের পরিমাণ কয়েক বছর ধরে উল্লেখযোগ্য ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সক্ষমতা বাবদ দেওয়া অর্থ প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল বলে বিভিন্ন খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ আমদানির ব্যয় এবং কেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিলও সরকারের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বিদ্যুৎ আমদানির বিপরীতে মোট বকেয়া বিলের পরিমাণ ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি ছিল বলে সংসদে জানানো হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের আদানি পাওয়ারের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে আলোচনা সবচেয়ে বেশি। ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় অবস্থিত কেন্দ্রটির দুটি ইউনিটের মোট স্থাপিত সক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী সেখান থেকে প্রায় ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে ২৫ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির ভিত্তিতে এই বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয় এবং ২০২৩ সালে কেন্দ্রটির বাণিজ্যিক সরবরাহ কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হয়।

গোড্ডা কেন্দ্রটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিদ্যুৎ উৎসে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট কারিগরি সমস্যার কারণে কয়েক দিন বন্ধ থাকার পর পুনরায় উৎপাদনে আসে। পরে সরবরাহ প্রায় ১ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়। এর আগে আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকে কেন্দ্রটি প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল। অর্থাৎ কোনো একটি বড় আমদানি উৎসে উৎপাদন বা সরবরাহ সাময়িকভাবে কমে গেলে জাতীয় গ্রিডে তার প্রভাব পড়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে আদানি বিদ্যুৎ নিয়ে বিতর্কের মূল জায়গা শুধু সরবরাহ নয়, বরং এর দাম ও চুক্তির আর্থিক কাঠামো। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আদানির বিদ্যুতের গড় মূল্য প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৮৬ পয়সা ছিল বলে প্রকাশিত খাতভিত্তিক তথ্য থেকে জানা যায়। একই সময়ে ভারতের অন্যান্য কয়েকটি উৎস থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল এর চেয়ে কম। ফলে আদানির বিদ্যুতের মূল্য তুলনামূলক বেশি কেন—এ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

অন্যদিকে আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে শুধু ব্যয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ সংকটের সময় আমদানিকৃত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকটে দেশীয় কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে না পারলে আমদানি করা বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে ভারসাম্য দিতে পারে। ফলে আমদানি চুক্তি বাতিল বা পরিবর্তনের প্রশ্নে সরবরাহ নিরাপত্তা, চুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা এবং আর্থিক ব্যয়—তিনটি বিষয়ই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ খাতের আরেক বড় বেসরকারি অংশীদার সামিট পাওয়ার। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, তারা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী এবং বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা সরবরাহ করছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে এলএনজি অবকাঠামোও যুক্ত। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জ্বালানি সরবরাহ—দুই ক্ষেত্রেই বেসরকারি খাতের নির্ভরতা বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

তবে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সমালোচনা থাকলেও এর পেছনে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ পরিকল্পনার বিষয়টি রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময় সরকারকে ভবিষ্যৎ চাহিদা, বিনিয়োগের নিরাপত্তা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা—এসব বিষয় বিবেচনা করতে হয়। বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিতে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে একটি কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় থাকার নিশ্চয়তা দেয় এবং বিনিয়োগকারী তার স্থাপিত সক্ষমতার বিপরীতে নির্দিষ্ট অর্থ পায়।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসনাতও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট নিয়ে সমালোচনার জবাব দিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, উদ্যোক্তারা সরকারের নীতিমালা ও চুক্তির বাইরে কোনো অর্থ দাবি করছেন না। ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ছাড়া বাংলাদেশের মতো বাজারে বেসরকারি উদ্যোক্তারা বড় অঙ্কের বিনিয়োগে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে আগ্রহী হবেন না বলেও তিনি যুক্তি দিয়েছেন। তার মতে, অতীতে কোনো নীতিমালার কারণে অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হয়ে থাকলে তার দায় উদ্যোক্তাদের ওপর না দিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সিদ্ধান্ত ও নীতিমালার দিকেই তাকানো উচিত।

এখানে মূল প্রশ্নটি হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সক্ষমতা কতটা এবং সেই সক্ষমতা ধরে রাখতে রাষ্ট্রকে কত ব্যয় করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা বা অন্যান্য জ্বালানি নিশ্চিত করা না গেলে স্থাপিত সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থাকতে পারে। আবার প্রয়োজনের তুলনায় সক্ষমতা কম হলে চাহিদার সময়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে বিদ্যুৎ পরিকল্পনায় শুধু উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো নয়, বরং চাহিদা, জ্বালানি সরবরাহ, সঞ্চালনব্যবস্থা ও আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।

বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভারসাম্যের প্রয়োজন রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের বিভিন্ন উৎস থেকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ আমদানি ১৬ হাজার গিগাওয়াট ঘণ্টার বেশি হয়েছে বলে খাতভিত্তিক তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এর একটি বড় অংশ এসেছে আদানি পাওয়ারের গোড্ডা কেন্দ্র থেকে। ফলে ভারতের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা এখন বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি স্থায়ী অংশ হয়ে উঠেছে। এই নির্ভরতা একদিকে সরবরাহের বিকল্প উৎস তৈরি করেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজার, বিনিময় হার এবং আন্তঃদেশীয় চুক্তির ওপর বাংলাদেশের ব্যয়ের একটি অংশকে নির্ভরশীল করেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, কয়লা ও অন্যান্য উৎসের বাস্তবসম্মত ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে যেসব চুক্তির মেয়াদ দীর্ঘ, সেগুলো নিয়মিতভাবে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করা জরুরি। চুক্তি বাতিল বা একতরফাভাবে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ ও আন্তর্জাতিক সালিশের ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে।

সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে সমস্যাটি কেবল আদানি বা কোনো একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ পরিকল্পনা, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, জ্বালানি সরবরাহ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, বিদ্যুৎ আমদানি এবং রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বড় কাঠামোগত বিষয়। ফলে বিদ্যুৎ খাতকে আরও স্থিতিশীল করতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, চুক্তির স্বচ্ছতা এবং ভোক্তার ওপর ব্যয়ের প্রভাব—সবগুলো বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ। শিল্পকারখানা, ব্যবসা, কৃষি, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবন—সবকিছুর সঙ্গে বিদ্যুৎ সরাসরি যুক্ত। তাই বিদ্যুৎ খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সুফল যেমন জনগণের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন, তেমনি অতিরিক্ত ব্যয় বা অদক্ষতার বোঝাও যেন ভোক্তার ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি না করে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। আদানি ও আইপিপি নিয়ে চলমান বিতর্ক শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য এমন একটি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা তৈরির প্রশ্নেই এসে দাঁড়ায়, যেখানে সরবরাহের নিশ্চয়তার সঙ্গে আর্থিক টেকসই ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্ব পাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত