নভেম্বরেও কাতারের এলএনজি নাও পেতে পারে বাংলাদেশ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
নভেম্বরেও কাতারের এলএনজি নাও পেতে পারে বাংলাদেশ

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। হরমুজ প্রণালিতে চলমান অচলাবস্থার কারণে কাতার এনার্জি তাদের এলএনজি সরবরাহে ‘ফোর্স মেজর’ নোটিশের মেয়াদ বাড়িয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ এশিয়ার কয়েকটি গ্রাহক দেশকে নভেম্বর পর্যন্ত এলএনজি কার্গো সরবরাহ করা সম্ভব হবে না বলে জানানো হয়েছে। একই পরিস্থিতিতে ইউরোপের বড় গ্রাহক ইতালির এডিসনও ডিসেম্বরের শুরু পর্যন্ত কাতারের কাছ থেকে কোনো এলএনজি কার্গো না পাওয়ার কথা জানিয়েছে।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারে কাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি সরবরাহকারী দেশ। বিশেষ করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে কাতারের গ্যাসের ওপর উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমদানি করা এলএনজি দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে কাতারের সরবরাহ বন্ধ থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার জ্বালানি সরবরাহ এবং সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সোমবার ইউরোপে কাতার এনার্জির অন্যতম বড় গ্রাহক এডিসন এবং সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সরবরাহ বিঘ্নের কারণে কাতারের এলএনজি কার্গো পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। এডিসন জানিয়েছে, ডিসেম্বরের শুরু পর্যন্ত তারা কাতার থেকে কোনো এলএনজি কার্গো পাবে না। একই সময়ে বাণিজ্যিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ এশিয়ার গ্রাহকদেরও নভেম্বর পর্যন্ত সরবরাহ না পাওয়ার বিষয়টি জানানো হয়েছে।

কাতার এনার্জির এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ হিসেবে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিকে উল্লেখ করা হয়েছে। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পরিবহনের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ব্যবহার করা হয়। প্রণালিটি স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করতে না পারলে কাতারের এলএনজি রপ্তানির ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। কারণ কাতারের এলএনজি রপ্তানির বড় অংশই সমুদ্রপথে বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে।

এই পরিস্থিতিতে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা বা নোটিশের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা এমন পরিস্থিতি, যার কারণে চুক্তিবদ্ধ সরবরাহ বা সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না, সেক্ষেত্রে চুক্তির আওতায় ফোর্স মেজর ধারা কার্যকর করা হতে পারে। কাতার এনার্জি এপ্রিল মাসে প্রথম এ ধরনের নোটিশ জারি করেছিল। এরপর পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় এর মেয়াদ একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে। এবারও সেই মেয়াদ বাড়িয়ে নভেম্বর পর্যন্ত সরবরাহে অক্ষমতার কথা জানানো হয়েছে।

এশিয়ার জন্য বিষয়টি বিশেষ উদ্বেগের কারণ, এই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে কাতার থেকে এলএনজি আমদানি করে। বাংলাদেশও কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির আওতায় গ্যাস আমদানি করে থাকে। ফলে নির্ধারিত কার্গো না এলে ঘাটতি পূরণে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের প্রয়োজন হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে সংকটের সময় অতিরিক্ত এলএনজি সংগ্রহ করা সাধারণত ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় এর প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে কাতারের সরবরাহ কতদিন বন্ধ থাকে, বিকল্প উৎস থেকে কতটা এলএনজি সংগ্রহ করা সম্ভব হয় এবং দেশে গ্যাসের সামগ্রিক চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতি কেমন থাকে তার ওপর। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানাগুলোতেও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গ্যাসের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে সার, শিল্প, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন উৎপাদন খাতে গ্যাস ব্যবহৃত হয়। আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা গ্যাসের ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন দেখা দিলে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব উৎপাদন খরচ, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পণ্যের দামের ওপরও পড়তে পারে।

এরই মধ্যে কাতারের এলএনজি রপ্তানিতে বড় ধরনের পতনের তথ্য পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরেছে। আগস্টের শেষ নাগাদ কাতারের এলএনজি রপ্তানি ৯৬ শতাংশ কমে যায়। ওই সময় পর্যন্ত দেশটি মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো রপ্তানি করতে পেরেছে। আগের বছরের একই সময়ে কাতারের এলএনজি কার্গো রপ্তানির সংখ্যা ছিল ৫০৯টি। অর্থাৎ স্বাভাবিক রপ্তানি কার্যক্রমের তুলনায় এবারের সরবরাহ পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকুচিত হয়েছে।

রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রভাব এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে পড়তে শুরু করেছে। সরবরাহ কমে গেলে যেসব দেশ কাতারের ওপর নির্ভরশীল, তাদের বিকল্প উৎসের দিকে যেতে হয়। কিন্তু একই সময়ে অন্যান্য দেশও যদি অতিরিক্ত গ্যাস সংগ্রহের চেষ্টা করে, তাহলে স্পট মার্কেটে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। এর ফলে এলএনজির দাম বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য তাই নভেম্বর পর্যন্ত কাতারের সরবরাহ বন্ধ থাকার সম্ভাবনা একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জ। কাতারের সরবরাহের ঘাটতি পূরণে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের পাশাপাশি বিদ্যমান গ্যাস সরবরাহের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হতে পারে। শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হলে কাতারের এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। তবে বর্তমান ঘোষণায় নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশসহ কয়েকটি এশীয় গ্রাহককে সরবরাহ না দেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়েছে। ফলে স্বল্পমেয়াদে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই সামনে রয়েছে।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্যও এর সম্ভাব্য প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার কার্যক্রমে চাপ পড়তে পারে, যার পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে বাজার ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর। বিশেষ করে শিল্প উৎপাদনের খরচ বেড়ে গেলে কিছু পণ্যের দামেও তার প্রভাব দেখা দিতে পারে। যদিও সরবরাহ ঘাটতির প্রকৃত প্রভাব এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়, দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন হলে ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে কাতার এনার্জির ফোর্স মেজর নোটিশের মেয়াদ বাড়ানোর ঘটনায় বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নভেম্বর পর্যন্ত সরবরাহ না পাওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহ, আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং কাতারের রপ্তানি সক্ষমতা আগামী সপ্তাহগুলোতে কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তার ওপর বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতির পরবর্তী চিত্র অনেকটাই নির্ভর করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত