তালা ভেঙে চুয়েটের দপ্তরে নতুন উপাচার্য, অচলাবস্থা অব্যাহত

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫ বার
তালা ভেঙে চুয়েটের দপ্তরে নতুন উপাচার্য, অচলাবস্থা অব্যাহত

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শিক্ষার্থীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতির মধ্যেই চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্যের দপ্তরে প্রবেশ করেছেন নতুন নিয়োগ পাওয়া অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল ৯টার দিকে ক্যাম্পাসে পৌঁছে উপাচার্য ভবনের ফটকে লাগানো তালা ভেঙে নিজের দপ্তরে প্রবেশ করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যে তাঁর এই প্রবেশ নতুন করে পরিস্থিতির দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তবে উপাচার্যের দপ্তরে প্রবেশের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থার অবসান হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, একটি হাইয়েস মাইক্রোবাসে করে ক্যাম্পাসে পৌঁছান অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। ক্যাম্পাসের প্রবেশপথে তিনি নিজেকে শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন বলে সূত্রটি জানিয়েছে। পরে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার সঙ্গে নিয়ে উপাচার্য ভবনের ফটকে লাগানো তালা ভেঙে নিজের দপ্তরে যান তিনি। সোমবার সকালে উপাচার্য ভবনে গিয়ে তাঁকে উপাচার্যের জন্য নির্ধারিত চেয়ারে বসে থাকতে দেখা যায়।

এ সময় তাঁর কক্ষে চুয়েট শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান আল সাবিত এবং সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব হোসাইন উপস্থিত ছিলেন। ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান আল সাবিত বলেন, তাঁরা একসঙ্গেই ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেছেন। তবে তালা ভাঙার সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অন্য কোনো কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন কি না কিংবা ঘটনাটির পর শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে কী প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের অধ্যাপক। গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে তাঁকে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নতুন উপাচার্য নিয়োগের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পরদিন থেকেই শিক্ষার্থীরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন। তাঁদের দাবি, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল করতে হবে। এই দাবিতে উপাচার্য ভবনের ফটকে তালা দেওয়া হয়। একই দাবিতে শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও কর্মবিরতি পালন করে আসছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান বিরোধের কারণে প্রায় ২০ দিন ধরে ক্লাস ও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। প্রকৌশল শিক্ষার মতো ব্যবহারিক ও পরীক্ষানির্ভর বিষয়ে দীর্ঘ সময় ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকলে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পরিকল্পনা, সেমিস্টার শেষ করার সময়সূচি এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের পরীক্ষা বা ব্যবহারিক কাজ নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল, তাঁদের জন্য এমন পরিস্থিতি বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে নতুন উপাচার্য এত দিন ক্যাম্পাসে যেতে পারেননি বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে। তবে তিনি ২৪ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর যোগদানপত্র পাঠিয়ে উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন। অর্থাৎ, ক্যাম্পাসে সরাসরি উপস্থিত হতে না পারলেও তিনি ওই তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এরপরও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে তাঁর দায়িত্ব পালন নিয়ে যে বিরোধ চলছিল, সোমবার দপ্তরে প্রবেশের ঘটনা সেই বিরোধকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন অচলাবস্থা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সাধারণত শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ বজায় রাখা, প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সমন্বয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সেই পদে নিয়োগ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তার প্রভাব শুধু প্রশাসনিক ভবনে সীমাবদ্ধ থাকে না; শিক্ষা কার্যক্রম, গবেষণা, পরীক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

চুয়েটের বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের দাবি, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবস্থান এবং নতুন উপাচার্যের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে আন্দোলন করছেন। অন্যদিকে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং তিনি যোগদানপত্র পাঠিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন বলে জানা গেছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমাধান খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সংলাপ, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য শোনা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও দাবি কী, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আপত্তির ভিত্তি কী এবং নিয়োগসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা কী—এসব বিষয় স্পষ্ট হলে সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার জন্য বাস্তবসম্মত সময়সূচি নির্ধারণ এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্ষতি কমানোর পরিকল্পনাও প্রয়োজন।

দীর্ঘ সময় ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে পারে। সেমিস্টার পিছিয়ে যাওয়া, পরীক্ষার সময়সূচি পরিবর্তন এবং শিক্ষাজীবনের পরবর্তী ধাপ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতিও প্রশাসনিক কাজকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে বিরোধ দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব একাধিক পক্ষের ওপর পড়বে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালু করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সংশ্লিষ্ট সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত।

সোমবার তালা ভেঙে উপাচার্যের দপ্তরে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের প্রবেশের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম কতটা স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হবে, তা এখন দেখার বিষয়। তাঁর প্রবেশের পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি অব্যাহত রাখবেন কি না, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আলোচনার উদ্যোগ নেবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।

চুয়েটের চলমান সংকটের সমাধান শুধু উপাচার্যের দপ্তরে প্রবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বৈধতা নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি, শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালু করা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপরও নির্ভর করছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে পারলে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পথ তৈরি হতে পারে। আপাতত নতুন উপাচার্যের দপ্তরে প্রবেশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে চুয়েটের পরবর্তী পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com