টঙ্গীতে শিশুকে নিপীড়নের অভিযোগ, শিক্ষক কারাগারে

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৭ বার
টঙ্গীতে শিশুকে নিপীড়নের অভিযোগ, শিক্ষক কারাগারে

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে একটি মাদ্রাসার শিক্ষক মোসলেম আহম্মদকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেছেন। অন্যদিকে, অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধর, মাদ্রাসার কার্যালয় ভাঙচুর এবং অর্থ ও মোবাইল ফোন লুটের অভিযোগ তুলে পৃথক মামলা করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ। একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুটি পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে এলাকায় আলোচনা ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, শিশুকে নিপীড়নের অভিযোগে করা মামলায় শিক্ষককে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মাদ্রাসায় হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে।

ঘটনাটি ঘটেছে টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার ক্বারীউল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায়। শিশুটির বাবার করা মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত সোমবার মাদ্রাসার নিচতলার সিঁড়িতে শিশুটিকে যৌন নিপীড়ন করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ পর্যায়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হলেও অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হওয়া বাকি।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা ঘটনার পর বুধবার দুপুরে শিশুটির স্বজনেরা মাদ্রাসায় গিয়ে শিক্ষক মোসলেম আহম্মদের কাছে বিষয়টি জানতে চান। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ঘটনাটি জানাজানি হলে স্থানীয় লোকজনও সেখানে জড়ো হন। পরে শিক্ষককে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরিস্থিতির খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে করা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং বৃহস্পতিবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

শিক্ষককে মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি ঘিরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বা কোনো পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে পুরো ঘটনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অভিযোগের সত্যতা, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণে তদন্তের ফলাফল ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ আলমাছ হোসেন অভিযোগ করেছেন, শিশুটির বাবার নেতৃত্বে ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি দল প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে শিক্ষক মোসলেম আহম্মদকে মারধর করে। তাঁকে রক্ষা করতে গেলে অন্য শিক্ষক-শিক্ষিকা ও নিরাপত্তাকর্মীরাও হামলার শিকার হন বলে তাঁর দাবি। এ সময় মাদ্রাসার কার্যালয় ভাঙচুর করা হয় এবং ১৭ লাখ টাকা ও মোবাইল ফোন লুট করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দেওয়া অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে।

শুক্রবার বিকেলে মাদ্রাসা ভবনের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ। সেখানে বক্তারা বলেন, শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে এবং প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন করতে হবে। একই সঙ্গে তাঁরা অভিযোগের ভিত্তিতে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে শিক্ষককে মারধর, প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর কিংবা লুটপাটের মতো কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করেন। তাঁদের বক্তব্য, কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠলে তার বিচার হওয়া উচিত আইন অনুযায়ী; ব্যক্তিগতভাবে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।

এর আগে ‘শানে সাহাবা খতিব ফাউন্ডেশন’সহ কয়েকটি ধর্মীয় সংগঠনের নেতারা শিক্ষককে মারধরের ঘটনার নিন্দা জানান। হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করা না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন সংগঠনটির নেতারা। ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শামীম মজুমদার বলেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে। এ ধরনের বক্তব্যের পাশাপাশি শিশুর নিরাপত্তা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনগত অধিকার—সব বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনায় রাখা জরুরি।

অন্যদিকে, মাদ্রাসায় লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শিশুটির বাবা। গণমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, ঘটনার পর বিভিন্ন জায়গা থেকে তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও হুমকিমূলক মন্তব্য করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তিনি। এতে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন শিশুটির বাবা। তাঁর এই অভিযোগের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। তবে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।

টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুর রহমান জানান, শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে করা মামলায় শিক্ষক মোসলেম আহম্মদকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও শিক্ষকদের মারধরের অভিযোগে শুক্রবার প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ পৃথক অভিযোগ দিয়েছে। ওই অভিযোগে একজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা হিসেবে ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করার কথা জানানো হয়েছে। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ঘটনাটির সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক হলো, অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে মাত্র সাত বছর বয়সী একটি শিশু। এ বয়সে শিশুরা নিজেদের অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে বা আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা বুঝতে অনেক সময় অসুবিধায় পড়ে। তাই অভিযোগের তদন্তের পাশাপাশি শিশুটির মানসিক নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। শিশুটির পরিচয় প্রকাশ পায়, এমন কোনো তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকা উচিত। একই সঙ্গে তাকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করে মানসিক চাপ বাড়ানো বা সামাজিকভাবে বিব্রত করার মতো পরিস্থিতি এড়ানো জরুরি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিশুদের শেখা, বেড়ে ওঠা ও নিরাপদ পরিবেশে সময় কাটানোর গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। অভিভাবকেরা সন্তানদের সেখানে পাঠানোর সময় তাদের নিরাপত্তার ওপর আস্থা রাখেন। ফলে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর প্রতি নিপীড়নের অভিযোগ উঠলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট পরিবার নয়, বৃহত্তর সমাজের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করে। এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ভূমিকা, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, দ্রুত তদন্ত এবং প্রয়োজন হলে শিশু সুরক্ষাসংক্রান্ত সহায়তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে অভিযোগ ওঠার পর কাউকে মারধর করা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচারব্যবস্থার। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত ও বিচার যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগের কারণে কাউকে বিচারবহির্ভূত শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা রোধ করাও আইনের শাসনের অংশ। মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর, অর্থ ও মোবাইল ফোন লুটের অভিযোগও একইভাবে প্রমাণ ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।

এ ঘটনায় এখন দুটি পৃথক অভিযোগের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে শিশুটির প্রতি কথিত যৌন নিপীড়নের অভিযোগের সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি নির্ধারণ করতে হবে। অন্যদিকে মাদ্রাসায় মারধর, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগেরও যথাযথ অনুসন্ধান প্রয়োজন। কোনো পক্ষের বক্তব্যকে আগেভাগে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে না নিয়ে প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই ন্যায়বিচারের জন্য অপরিহার্য।

টঙ্গীর এ ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর সুরক্ষা যেন কোনোভাবেই উপেক্ষিত না হয়, আবার অভিযোগের বিচার যেন সহিংসতা বা প্রতিশোধের মাধ্যমে পরিচালিত না হয়। তদন্তের অগ্রগতি, পুলিশের পদক্ষেপ এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ঘটনার প্রকৃত সত্য সামনে আসবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com