দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার করার লক্ষ্য নিয়ে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে সিউলে পৌঁছেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান। সোমবার (২ নভেম্বর) দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানীতে পৌঁছান তিনি। দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের আমন্ত্রণে এই সফরে গেছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। সফরে দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সিউলের কাছের সিওংনাম শহরে অবস্থিত সিউল বিমানঘাঁটিতে এরদোয়ান ও তাঁর স্ত্রী এমিনে এরদোয়ানকে স্বাগত জানানো হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে তাঁদের অভ্যর্থনা জানান বাণিজ্যমন্ত্রী পার্ক জং-সুং। এ সময় দক্ষিণ কোরিয়ায় নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত ফাতিহ ইলদিজ ও তাঁর স্ত্রী নেসরিন ইলদিজ উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রীয় সফরের আনুষ্ঠানিকতা অনুযায়ী বিমানবন্দরে এই অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে এরদোয়ানের দক্ষিণ কোরিয়া সফর শুরু হয়।
তুর্কি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তা। তাঁদের মধ্যে আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান, জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদমন্ত্রী আলপারস্লান বায়রাকতার, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াশার গুলের এবং শিল্প ও প্রযুক্তিমন্ত্রী মেহমেত ফাতিহ জাসির। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একে পার্টি) উপপ্রধান ও স্বাস্থ্যনীতিবিষয়ক প্রধান হালিত ইয়েরেবাকান এবং প্রতিরক্ষা শিল্পবিষয়ক সচিব হালুক গোরগুনও সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন।
সফরে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের উপস্থিতি থেকে বোঝা যায়, দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা গুরুত্ব পেতে পারে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দুই পক্ষের আগ্রহ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বৈঠকে কোন কোন বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে, তা আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও পরবর্তী ঘোষণার পর স্পষ্ট হবে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবেন এরদোয়ান। বৈঠকে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্বের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়েও দুই নেতার আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতিতে নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মতো বিষয় দুই দেশের আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
তুরস্ক ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি ঐতিহাসিক বন্ধনও রয়েছে। কোরীয় যুদ্ধের সময় তুরস্ক দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে সেনা পাঠিয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা দুই দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পর্ক প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, শিল্প ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে।
বর্তমানে তুরস্ক ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া উন্নত প্রযুক্তি, শিল্প উৎপাদন, ইলেকট্রনিকস, গাড়ি নির্মাণ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে বিশ্ববাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। দুই দেশের সক্ষমতা ও ভৌগোলিক অবস্থানের ভিন্নতা পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিল্প উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং জ্বালানি খাতে যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা রয়েছে।
তুরস্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ড্রোন, সামরিক যান, নৌযান ও বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে দেশটি সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দক্ষিণ কোরিয়াও আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ফলে দুই দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতি সফরের আলোচনায় এ খাতের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। তবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি বা প্রকল্প চূড়ান্ত হয়েছে কি না, তা আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ওপর নির্ভর করবে।
জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ খাতও সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে অনিশ্চয়তা, সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণের কারণে দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজন বাড়ছে। তুরস্কের জ্বালানি খাতের অভিজ্ঞতা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে নতুন বিনিয়োগ ও যৌথ প্রকল্পের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়লে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালী করতে সফরকালে কয়েকটি চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। এসব চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে চুক্তিগুলোর সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের পর জানা যাবে।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়েও দুই নেতার আলোচনার কথা রয়েছে। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন নিরাপত্তা পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তুরস্ক ও দক্ষিণ কোরিয়া উভয় দেশই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখে। তাই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি বৈশ্বিক সংকট, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলোও বৈঠকে স্থান পেতে পারে।
সফরটি আগামী ৪ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। এই সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রীয় বৈঠক, আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি এবং সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সফরের শেষ দিকে দুই দেশের পক্ষ থেকে আলোচনার অগ্রগতি ও চুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হতে পারে।
সব মিলিয়ে, এরদোয়ানের দক্ষিণ কোরিয়া সফর দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেওয়ার একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ। রাজনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে এই সফরের মাধ্যমে। তবে আলোচনার বাস্তব ফলাফল নির্ভর করবে বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত, স্বাক্ষরিত চুক্তি এবং সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত