নোয়াখালীতে নতুন গ্যাসকূপে বড় মজুতের সন্ধান

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৯ বার
নোয়াখালীতে নতুন গ্যাসকূপে বড় মজুতের সন্ধান

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে নতুন একটি অনুসন্ধান কূপে গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার খবরে দেশের জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনার তৈরি হয়েছে। উপজেলার রামপুর ইউনিয়নে খনন করা সুন্দলপুর সাউথ-১ কূপের দুটি পৃথক স্তরে প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৯৭ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত শনাক্ত করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হওয়ার পর কূপটি থেকে দৈনিক প্রায় এক কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে বলে আশা করছে সংস্থাটি।

নতুন এই গ্যাসের সন্ধান দেশের চলমান জ্বালানি চাহিদার প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক গ্রাহকদের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র বা কূপে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য মজুতের সন্ধান পাওয়া গেলে তা জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।

বাপেক্সের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোম্পানীগঞ্জের রামপুর ইউনিয়নে সুন্দলপুর সাউথ-১ অনুসন্ধান কূপটির খননকাজ শুরু হয়েছিল গত ৮ জুলাই। সংস্থাটির নিজস্ব বিজয়-১০ রিগ ব্যবহার করে প্রায় সাড়ে তিন মাসের মধ্যে কূপটি খনন করা হয়। খননের সময় কূপটি প্রায় তিন হাজার ২৮৯ মিটার গভীরতায় নেওয়া হয়। এরপর বিভিন্ন স্তরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়।

কূপটির অবস্থান ও সম্ভাবনা নির্ধারণে আগেই ত্রিমাত্রিক বা থ্রিডি ভূকম্পন জরিপ পরিচালনা করা হয়েছিল। ভূগর্ভের বিভিন্ন স্তরের গঠন সম্পর্কে ধারণা পেতে এই ধরনের জরিপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জরিপের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাবনাময় এলাকায় অনুসন্ধান কূপ খননের সিদ্ধান্ত নেয় বাপেক্স। সেই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সুন্দলপুর সাউথ-১ কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

খনন শেষ হওয়ার পর কূপের দুটি পৃথক স্তরে গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই দুই স্তরে সম্ভাব্য গ্যাসের মজুত ৯ হাজার ৭৬৯ কোটি ঘনফুট। আন্তর্জাতিকভাবে গ্যাসের মজুত হিসাবের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ের নির্ভরযোগ্যতা ও শ্রেণিবিন্যাস থাকে। তাই প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত সম্ভাব্য মজুতের পুরো অংশ ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন করা যাবে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন হবে।

গত সোমবার সন্ধ্যায় কূপের মুখে অগ্নি-প্রজ্বালনের মাধ্যমে গ্যাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে কূপ থেকে গ্যাসের প্রবাহ ও বৈশিষ্ট্য যাচাইয়ের বিভিন্ন পরীক্ষার অংশ হিসেবে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সুন্দলপুর সাউথ-১ কূপেও প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষা শেষে গ্যাসের উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বাপেক্স।

কূপটির প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক গ্যাস পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কূপটির সম্ভাব্য মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে প্রাথমিকভাবে আশাবাদী হলেও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও মূল্যায়নের ধাপগুলো সম্পন্ন করতে হবে। উৎপাদন শুরু হলে দৈনিক প্রায় এক কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রাথমিক হিসাবে কূপের গ্যাসের সম্ভাব্য বাজারমূল্যও নির্ধারণ করেছে বাপেক্স। ভোক্তা পর্যায়ের বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনায় প্রায় ৯৭ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের আনুমানিক মূল্য পাঁচ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে এই হিসাব গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত ও বর্তমান বাজারমূল্যের ওপর ভিত্তি করে করা একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন। প্রকৃত আর্থিক মূল্য নির্ভর করবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ, উৎপাদন ব্যয়, গ্যাসের মান, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ বাজারমূল্যের ওপর।

বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় প্রাকৃতিক গ্যাসের গুরুত্ব দীর্ঘদিনের। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প ও সার উৎপাদন পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে গ্যাসের ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু দেশে বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা সময়ের সঙ্গে কমে আসা, চাহিদা বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতার কারণে গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে দেশীয় উৎস থেকে নতুন গ্যাসের সন্ধান পাওয়া জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় স্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

কোম্পানীগঞ্জে নতুন এই কূপের সন্ধান শুধু স্থানীয় অর্থনীতির জন্য নয়, বৃহত্তর জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থার জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। গ্যাস উত্তোলন ও জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সক্ষমতা তৈরি হলে দেশের মোট সরবরাহে নতুন উৎস যোগ হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সংশ্লিষ্ট সেবা খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার পরপরই পুরো মজুতকে ব্যবহারযোগ্য ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। ভূগর্ভে গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়া এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক মাত্রায় দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস উত্তোলন করা—এই দুটি বিষয় এক নয়। একটি অনুসন্ধান কূপ থেকে নিয়মিত উৎপাদন শুরু করার আগে গ্যাসের চাপ, প্রবাহের হার, গুণগত বৈশিষ্ট্য, মজুতের প্রকৃতি এবং কূপের উৎপাদনক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত পরীক্ষা প্রয়োজন হয়। এসব পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয় কূপটি কতটা কার্যকরভাবে উৎপাদনে নেওয়া সম্ভব।

সুন্দলপুর সাউথ-১ কূপের ক্ষেত্রেও এখন সেই মূল্যায়নের পর্যায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রাথমিক ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও নিয়মিত উৎপাদন শুরু হলে কূপটি কত পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে এবং কতদিন পর্যন্ত তা বজায় রাখা সম্ভব হবে, সেটিই হবে মূল বিষয়। পাশাপাশি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পাইপলাইন ও অন্যান্য কারিগরি ব্যবস্থা প্রস্তুত করাও জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বিদ্যমান কূপগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু নতুন কূপ আবিষ্কার করলেই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। অনুসন্ধান, উত্তোলন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও সুষ্ঠু বিতরণ—প্রতিটি ধাপকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হয়।

কোম্পানীগঞ্জের সুন্দলপুর সাউথ-১ কূপের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে যে পরিমাণ গ্যাসের সম্ভাব্য মজুতের কথা বলা হয়েছে, তা বাস্তবে কতটা উত্তোলনযোগ্য এবং কূপটি জাতীয় গ্রিডে কতটা কার্যকর অবদান রাখতে পারবে, তা আগামী দিনের পরীক্ষায় আরও স্পষ্ট হবে। তবে দেশের অভ্যন্তরে অনুসন্ধান চালিয়ে নতুন গ্যাসের সম্ভাবনা শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে শিল্প উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের প্রয়োজন রয়েছে। সেই জায়গা থেকে নোয়াখালীর মাটির নিচে পাওয়া নতুন গ্যাসের এই সম্ভাবনা স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতি ও জ্বালানি ব্যবস্থার জন্যও আগ্রহের বিষয়। এখন প্রয়োজন নির্ভুল মূল্যায়ন, নিরাপদ উত্তোলন এবং দ্রুত কিন্তু পরিকল্পিতভাবে উৎপাদনে নেওয়ার উদ্যোগ। প্রাথমিক অনুসন্ধানের সাফল্য শেষ পর্যন্ত দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় কতটা বাস্তব সুবিধা এনে দিতে পারে, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com