ধর্ষণ মামলা না তোলায় বিধবা ও তিন মেয়েকে ঘরছাড়া

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
ধর্ষণ মামলা না তোলায় বিধবা ও তিন মেয়েকে ঘরছাড়া

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বগুড়ার ধুনটে ধর্ষণ মামলা তুলে না নেওয়াকে কেন্দ্র করে এক বিধবা নারী ও তাঁর তিন এতিম মেয়েকে ঘরছাড়া করার অভিযোগ উঠেছে। স্বামীর মৃত্যুর পর তিন সন্তানকে নিয়ে যে বাড়িতে বসবাস করছিলেন, সেখানে এখন ঝুলছে তালা। অভিযোগকারীর দাবি, মামলা দায়েরের পর থেকেই আসামিপক্ষের লোকজন মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাকে নানা ধরনের চাপ দিয়ে আসছিল। একপর্যায়ে তাকে ও তাঁর মেয়েদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। বর্তমানে বাধ্য হয়ে সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন ওই নারী।

ঘটনাটি বগুড়ার ধুনট উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের মথুরাপুর গ্রামে। এ ঘটনায় শুধু ঘরছাড়া হওয়ার অভিযোগই নয়, মামলা দায়েরের পর দুই মাসের বেশি সময় পার হলেও তাঁর ডাক্তারি পরীক্ষা না করার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগী। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রতিকার চেয়ে বগুড়ার পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন তিনি। তবে তদন্ত কর্মকর্তা তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় এক বছর আগে তাঁর স্বামী মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর তিন মেয়েকে নিয়ে তিনি স্বামীর বাড়িতেই বসবাস করে আসছিলেন। স্বামীহারা হয়ে সন্তানদের নিয়ে একা থাকার কারণে তিনি নানা ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে প্রতিবেশী রেজাউল করিম তাকে বিভিন্ন সময় অনৈতিক প্রস্তাব দিতেন। তিনি ওই প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন ওই নারী।

ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২১ আগস্ট রাতে রেজাউল করিম তাঁর ঘরে প্রবেশ করেন। এ সময় গলায় চাকু ধরে তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। ঘটনার পরদিন, ২২ আগস্ট, তিনি ধুনট থানায় অভিযোগ নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাশিত প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগ করে পরে আদালতের শরণাপন্ন হন তিনি।

এরপর গত ২৭ আগস্ট বগুড়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলা করেন ওই নারী। আদালতের নির্দেশের পর ধুনট থানা গত ১৩ সেপ্টেম্বর মামলাটি এজাহার হিসেবে রেকর্ড করে। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ধুনট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ওসমান গনিকে।

মামলা রেকর্ড হওয়ার পর থেকেই আসামিপক্ষের লোকজন মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দিতে থাকে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী। তাঁর দাবি, তিনি মামলা তুলে নিতে রাজি না হওয়ায় একপর্যায়ে তাকে ও তাঁর তিন মেয়েকে বসতঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর ঘরে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের নিয়ে যে বাড়িটিকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ধরে রেখেছিলেন, সেই ঘরেই এখন প্রবেশ করতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

এ অবস্থায় তিন সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন ওই নারী। একদিকে স্বামীহারা হয়ে সন্তানদের দায়িত্ব বহন করা, অন্যদিকে ধর্ষণের অভিযোগের বিচার পাওয়ার চেষ্টা এবং বসতঘর হারানোর পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে তাঁর ও সন্তানদের জীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীর অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাঁর ডাক্তারি পরীক্ষা। তিনি দাবি করেছেন, মামলা দায়েরের পর দুই মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও তাঁর ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ডাক্তারি পরীক্ষার খরচ বাবদ ৪ হাজার টাকা দেওয়ার পরও অজ্ঞাত কারণে পরীক্ষা করানো হয়নি। এ কারণে ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত শারীরিক আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ওই নারী। তাঁর দাবি, তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ওসমান গনি মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে প্রধান আসামি রেজাউল করিমকে গ্রেপ্তার করছেন না। এ কারণে মামলার তদন্ত কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। অভিযোগের বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন ভুক্তভোগী।

তবে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ওসমান গনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, মামলার তদন্ত কার্যক্রম নিয়ম অনুযায়ী এগিয়ে চলছে এবং ইতোমধ্যে সাক্ষীদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। ভুক্তভোগীকে নারী পুলিশ সদস্যের সঙ্গে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল বলেও জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু সেদিন চিকিৎসক না থাকায় তাঁর ডাক্তারি পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

ধুনট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল ইসলামও জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশে গত ১৩ সেপ্টেম্বর মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে। মামলার তদন্ত চলছে এবং যেকোনো সময় ভুক্তভোগীর ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে বলে তিনি জানান।

তবে ডাক্তারি পরীক্ষা নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা জানিয়েছেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মোজাম্মেল হক। তাঁর মতে, যৌন সহিংসতার অভিযোগের ক্ষেত্রে আলামত সংগ্রহে দীর্ঘ বিলম্ব তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে। তিনি এ ধরনের বিলম্বকে আইনের ব্যত্যয় হিসেবে উল্লেখ করে তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হোসাইন মুহাম্মদ রায়হান জানিয়েছেন, অভিযোগের পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। আলামত সংগ্রহে কোনো ধরনের ব্যত্যয় বা দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

ঘটনাটি ঘিরে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে ভুক্তভোগী নারী ও তাঁর তিন মেয়ের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার। স্বামীহীন একটি পরিবারের জন্য বসতঘর হারানো শুধু মাথা গোঁজার জায়গা হারানো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সন্তানদের নিরাপত্তা, পড়াশোনা, সামাজিক অবস্থান এবং দৈনন্দিন জীবনের স্থিতিশীলতা। মামলা করার পর যদি কোনো অভিযোগকারীকে বাড়ি ছাড়তে হয় বা মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপের মুখে পড়তে হয়, তাহলে বিচারপ্রক্রিয়ায় তার আস্থা ও অংশগ্রহণও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশেষ করে যৌন সহিংসতার অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযোগকারীকে সামাজিক চাপ, ভয়ভীতি বা প্রতিশোধের আশঙ্কা থেকে সুরক্ষা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার। তাই কোনো পক্ষের অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার পরিবর্তে যথাযথ তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইন অনুযায়ী বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

এ ঘটনায় একদিকে ধর্ষণের অভিযোগের তদন্ত, অন্যদিকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ ও ঘরছাড়া করার অভিযোগ—দুই বিষয়ই আলাদাভাবে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে ডাক্তারি পরীক্ষা কেন এতদিনেও সম্পন্ন হয়নি, সে বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আসা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ একটি মামলার প্রমাণ সংগ্রহে সময়ের গুরুত্ব থাকলেও তদন্তের প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে সম্পন্ন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এখন ভুক্তভোগী নারী ও তাঁর তিন মেয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং মামলা-সংশ্লিষ্ট আলামত ও সাক্ষ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে প্রধান দায়িত্ব। পাশাপাশি তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ সত্য কি না, সেটিও যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অবস্থানও পরিষ্কার হওয়া দরকার।

ধুনটের এই ঘটনায় শেষ পর্যন্ত কী ফল দাঁড়ায়, তা নির্ভর করবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর। তবে একজন স্বামীহারা নারী এবং তাঁর তিন সন্তানের জন্য ন্যায়বিচারের পাশাপাশি নিরাপদে বসবাসের সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের সত্যতা আদালত ও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে; কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ যেন নিরপেক্ষ, সময়োপযোগী ও আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়—এটাই এখন ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় মানুষের প্রধান প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com