প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের সরকারি দুটি গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালে দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের কিডনি রোগীদের জন্য বিনামূল্যের ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলেও বিকল্প ব্যবস্থায় সেবা চালুর প্রস্তুতি এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। নতুন ডায়ালাইসিস যন্ত্র কেনা ও স্থাপনের প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দেওয়ায় এই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছেন নিয়মিত ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল স্বল্প আয়ের রোগীরা।
ঢাকার জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায় দীর্ঘদিন ধরে ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৪ মার্চ থেকে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান স্যান্ডরের মাধ্যমে এই দুই হাসপাতালে ১০১টি ডায়ালাইসিস যন্ত্র ব্যবহার করে রোগীদের সেবা দেওয়া শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সরকারের ১০ বছর মেয়াদি চুক্তির মেয়াদ আগামী ২৯ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর না হলে নিয়মিত ডায়ালাইসিস নেওয়া রোগীদের সামনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। কিডনি অকার্যকর হয়ে পড়া রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস কোনো ঐচ্ছিক চিকিৎসা নয়; নির্দিষ্ট সময় পরপর এই চিকিৎসা নিতে হয়। ফলে সরকারি হাসপাতালে কম খরচে বা বিনামূল্যে পাওয়া সেবা বন্ধ হলে অনেক রোগীর জন্য বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
স্যান্ডরের সহকারী ব্যবস্থাপক তায়েফ রহমান জানিয়েছেন, চুক্তি নবায়ন বা ভবিষ্যৎ ব্যবস্থা সম্পর্কে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন সরকারি ব্যবস্থা চালু হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এ ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা কখন এবং কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি।
সরকার ইতোমধ্যে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডায়ালাইসিস সেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। এরই মধ্যে দুটি দরপত্র বাতিল হয়েছে। সর্বশেষ তৃতীয় দরপত্রে নতুন কিছু শর্ত যুক্ত হওয়ায় তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসব শর্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, নতুন শর্তের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দরপত্রে অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর এক হাজার ৩০টি ডায়ালাইসিস যন্ত্র কেনার জন্য প্রথমবার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এ জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় ২৬৭ কোটি টাকা। প্রথম দরপত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ৭০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদনও বাধ্যতামূলক করা হয়। পরে কোনো কারণ উল্লেখ না করেই সেই দরপত্র বাতিল করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এরপর একই বছরের ২৩ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। এবার কাজের অভিজ্ঞতার শর্ত উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা করা হয়। তবে অন্যান্য শর্ত আগের মতোই রাখা হয়। দ্বিতীয় দফায় চারটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয়। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানই নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে না পারায় দ্বিতীয়বারও দরপত্র বাতিল হয়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে নতুন করে ডায়ালাইসিস যন্ত্র কেনার বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা বা এপিপি অনুমোদন করা হয়। প্রকল্প পরিচালক হিসেবে অধ্যাপক ড. আ ন ম এহসানুল করীমকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর তৃতীয়বারের মতো দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই পর্যায়ে আগের শর্তের তুলনায় কয়েকটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
সর্বশেষ দরপত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ১৬০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অন্তত এক হাজার ডায়ালাইসিস যন্ত্র সরবরাহ ও স্থাপনের অভিজ্ঞতার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি যন্ত্রের মনিটরের আকার ১৫ ইঞ্চি থেকে কমিয়ে ১০ ইঞ্চি করার কথা বলা হয়েছে। ডায়ালাইসিস যন্ত্রের সঙ্গে ব্যবহারের জন্য ডায়ালাইজারের সংখ্যাও আগের দরপত্রের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে সরকারের ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ দরপত্রে যুক্ত হওয়া এসব শর্ত নিয়ে পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আপত্তি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, শর্তগুলো এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যে দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সেগুলো পূরণ করে দরপত্রে অংশ নেওয়া কঠিন। কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য এসব শর্ত সুবিধাজনক হতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দরপত্রে শর্ত পরিবর্তনের কারণ জানতে প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. আ ন ম এহসানুল করীমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বিস্তারিত বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তিনি তখন রোগী দেখছেন জানিয়ে পরে যোগাযোগ করতে বলেন। পরবর্তী সময়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কাছ থেকে আর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কেনাকাটার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে রোগীদের নিয়ে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন জানিয়েছেন, নতুন ডায়ালাইসিস যন্ত্র কেনাসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে নতুন মেশিন স্থাপনসহ পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগতে পারে। ফলে বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু না হওয়া পর্যন্ত একটি মধ্যবর্তী সময় তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে নিয়মিত ডায়ালাইসিস প্রয়োজন এমন রোগীরা কোথায় এবং কীভাবে চিকিৎসা নেবেন, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের রোগীদের জন্য বেসরকারি হাসপাতালে নিয়মিত ডায়ালাইসিসের ব্যয় বহন করা কঠিন হতে পারে। একটি পরিবারের একজন সদস্যের কিডনি রোগের চিকিৎসা অনেক সময় পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর চাপ তৈরি করে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে বা স্বল্প ব্যয়ে ডায়ালাইসিসের সুযোগ তাই অনেক পরিবারের জন্য জীবনরক্ষাকারী সহায়তা হিসেবে কাজ করে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল যন্ত্র কেনাকাটার প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, স্বাস্থ্য খাতের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতার ঘাটতি নয়, বরং প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত সিদ্ধান্তের কারণে অনেক সময় কেনাকাটায় জটিলতা তৈরি হয়। তাঁর অভিযোগ, আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে নানা ধরনের শর্ত আরোপ করা হলে যোগ্য প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত ভোগান্তির শিকার হন রোগীরা।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন, সরকার স্যান্ডরের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি নবায়ন না করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে। যন্ত্র কেনার প্রক্রিয়ায় গতি ফেরাতে কাজ চলছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর আশা, দ্রুত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।
সরকারি ব্যবস্থাপনায় ডায়ালাইসিস সেবা চালু করার উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে রোগীদের জন্য কার্যকর হতে পারে। তবে সেই ব্যবস্থায় যাওয়ার পথে যেন কোনোভাবেই চিকিৎসাসেবা বন্ধ না হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ডায়ালাইসিসের ক্ষেত্রে কয়েক মাস অপেক্ষা করার সুযোগ অনেক রোগীর থাকে না। নিয়মিত চিকিৎসা ব্যাহত হলে তাদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে।
এ কারণে নতুন যন্ত্র কেনার প্রক্রিয়া যেমন স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক হওয়া প্রয়োজন, তেমনি বর্তমান সেবা থেকে নতুন ব্যবস্থায় যাওয়ার সময় একটি কার্যকর অন্তর্বর্তী পরিকল্পনাও জরুরি। বেসরকারি হাসপাতালে অস্থায়ীভাবে বিনামূল্যে সেবা দেওয়ার যে আলোচনা চলছে, তা বাস্তবায়িত হলে রোগীদের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে এর জন্য সেবার পরিমাণ, রোগী বাছাই, অর্থের সংস্থান এবং হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।
ডায়ালাইসিস যন্ত্র কেনার ক্ষেত্রে শর্ত নির্ধারণ নিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে। যন্ত্রের মান, রোগীর নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, বিক্রয়োত্তর সেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে এমন শর্ত নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। একই সঙ্গে কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয় কি না, সে বিষয়টিও স্বচ্ছতার সঙ্গে যাচাই করা জরুরি।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যদি নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব না হয়, তাহলে নিয়মিত ডায়ালাইসিস নেওয়া রোগীদের জন্য বিকল্প সেবা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে জরুরি কাজ। বিশেষ করে যারা সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল এবং ব্যক্তিগতভাবে ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য রাখেন না, তাদের কথা বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সরকারি দুটি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা নিয়ে তৈরি হওয়া বর্তমান অনিশ্চয়তা তাই শুধু একটি কেনাকাটা বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে হাজারো কিডনি রোগীর নিয়মিত চিকিৎসা ও জীবনযাত্রা। নতুন যন্ত্র কেনা, স্থাপন ও সেবা চালুর প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সময়ে কোনো রোগী যেন চিকিৎসাবঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। সময়মতো কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে সংকট এড়ানো সম্ভব; অন্যথায় সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে সেই পরিবারগুলোর ওপর, যাদের কাছে প্রতিটি ডায়ালাইসিস সেশনই জীবন বাঁচিয়ে রাখার একটি অপরিহার্য ধাপ।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত