সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের, চাপে ট্রাম্প প্রশাসন

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের, চাপে ট্রাম্প প্রশাসন
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক সাফল্য পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। রিপাবলিকানদের কাছ থেকে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ফিরিয়ে নিয়েছে দলটি। এর ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের জন্য নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের উচ্চকক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোয় আগামী দুই বছর আইন প্রণয়ন, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের আগের মতো একক সুবিধা থাকবে না। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি ও তদন্তের সুযোগ বাড়বে ডেমোক্র্যাটদের।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীরা। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের রিপাবলিকান-প্রভাবিত অঙ্গরাজ্য সাউথ ক্যারোলাইনা ও নর্থ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাটদের জয় নির্বাচনের ফলাফলে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এসব জয়ের মধ্য দিয়ে শুধু সিনেটের আসনসংখ্যায় পরিবর্তন আসেনি, বরং ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যেও নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

সাউথ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান প্রার্থী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনেটর ডারলাইন গ্রাহামকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। এই জয়কে অঙ্গরাজ্যটির রাজনৈতিক ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, ১৯৯৮ সালের পর সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সিনেট নির্বাচনে জয়ী হননি। দীর্ঘ সময় ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত অবস্থান থাকা এই অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের জয় দলটির জন্য বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই আসনটি আগে রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের দখলে ছিল। চলতি বছরের জুলাইয়ে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বোন ডারলাইন গ্রাহামকে আসনটির দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে পূর্ণ মেয়াদের নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। তবে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজের কাছে পরাজিত হন। অ্যান্ড্রুজের এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রণে থাকা আসনটি ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যায়।

নর্থ ক্যারোলাইনাতেও রিপাবলিকানদের কাছ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিনেট আসন ছিনিয়ে নিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রয় কুপার। অঙ্গরাজ্যটির সাবেক দুই মেয়াদের গভর্নর কুপার রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলিকে পরাজিত করেছেন। এই আসনের আগের সিনেটর থম টিলিস পুনর্নির্বাচনে অংশ নেননি। ফলে আসনটি ঘিরে দুই দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত কুপারের জয় ডেমোক্র্যাটদের সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পথে বড় ভূমিকা রাখে।

নর্থ ক্যারোলাইনায় কুপারের জয় এবং সাউথ ক্যারোলাইনায় অ্যানি অ্যান্ড্রুজের সাফল্য নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত ফলাফল। বিশেষ করে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের এমন সাফল্য ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানরা সিনেটে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে থাকেনি।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আরও কঠিন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোনো বিল আইনে পরিণত করতে সাধারণত দুই কক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। ফলে সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত বিভিন্ন আইন নিয়ে আলোচনা, সংশোধন কিংবা বিরোধিতার সুযোগ বাড়বে।

এ ছাড়া বিচারক এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও সিনেটের ভূমিকা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট মনোনীত অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। ফলে নতুন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনকে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে এগোতে হতে পারে। বিশেষ করে বিচার বিভাগ ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য আরও দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ওপর কংগ্রেসীয় নজরদারিও বাড়তে পারে। সিনেটের সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর মাধ্যমে প্রশাসনের নীতি, সিদ্ধান্ত, সরকারি ব্যয় এবং বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে শুনানি ও তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং সরকারি নথিপত্র তলবের মতো পদক্ষেপও নেওয়া যেতে পারে। ফলে আগামী দুই বছর ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কংগ্রেসের উচ্চকক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তবে প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের বিষয়টি নিয়ে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া আলাদা। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসনের অভিযোগ উত্থাপন ও অনুমোদনের দায়িত্ব প্রতিনিধি পরিষদের। এরপর সিনেটে অভিশংসন বিচার অনুষ্ঠিত হয় এবং দোষী সাব্যস্ত করে পদ থেকে অপসারণের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হয়। তাই সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই ডেমোক্র্যাটরা এককভাবে প্রেসিডেন্টকে অভিশংসন করতে পারবেন—বিষয়টি এমন নয়। তবে কংগ্রেসের বিভিন্ন তদন্ত ও রাজনৈতিক জবাবদিহির উদ্যোগে নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা দলটির অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে।

নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রিপাবলিকানদের পরাজয়ের দায় নিজের ওপর নিতে চাননি তিনি। তাঁর বক্তব্য, তিনি নিজে নির্বাচনের ব্যালটে ছিলেন না। অর্থাৎ ভোটাররা সরাসরি তাঁর প্রেসিডেন্ট পদ নিয়ে ভোট দেননি বলে তিনি দলীয় পরাজয়ের দায় নিজের বলে মনে করেন না। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের প্রথম দুই বছরের কর্মকাণ্ডের ওপর ভোটারদের মনোভাব প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়।

এবারের ফলাফলও ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমতের একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তবে কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণকে নির্বাচনের ফলাফলের একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অঙ্গরাজ্যভেদে স্থানীয় ইস্যু, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং জাতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভোটারদের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে ফলাফল বিশ্লেষণে এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ চলছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলেও প্রতিনিধি পরিষদের ফলাফল এবং কংগ্রেসের দুই কক্ষের সামগ্রিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নির্বাচনের পরবর্তী গণনা ও ফল ঘোষণার দিকে নজর রয়েছে। দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও বাড়তে পারে। তবে প্রতিনিধি পরিষদে যে দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করুক, সিনেটে ক্ষমতার পরিবর্তন ইতোমধ্যে প্রশাসনের আইন প্রণয়ন ও নিয়োগসংক্রান্ত পরিকল্পনায় নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রেসিডেন্টের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। এতে কংগ্রেসের সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদেও নির্বাচন হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মতো জাতীয়ভাবে একজন প্রার্থীকে কেন্দ্র করে ভোট না হলেও মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি বাস্তবায়নের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পরিবর্তিত হলে প্রেসিডেন্টকে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করে কাজ করতে হয়।

এবারের নির্বাচনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রিপাবলিকানরা সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের সামনে এখন নির্বাচনী সাফল্যকে কার্যকর আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতে রূপ দেওয়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আগামী দুই বছরে দুই দলের মধ্যে সহযোগিতা, বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক দর-কষাকষি কোন দিকে এগোয়, তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতির গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় নির্ভর করবে।

 

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com