তাহসিফের মৃত্যু: ছায়া তদন্ত থেকে সরে দাঁড়াল পিবিআই

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৮ বার
তাহসিফের মৃত্যু: ছায়া তদন্ত থেকে সরে দাঁড়াল পিবিআই
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর রহস্য উদ্‌ঘাটনে তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আলোচিত এ মৃত্যুর ঘটনায় ছায়া তদন্ত থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই প্রতিবেদনেও মৃত্যুর কারণ নিশ্চিতভাবে উল্লেখ না থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মামলার তদন্ত আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন।

অন্যদিকে, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় তাঁর বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে তৃতীয় দফায় আরও তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। মামলার আরেক আসামি জেরিকা তাসনিম দিশাও রিমান্ডে রয়েছেন। তদন্তকারীরা ঘটনার আগের ও পরের সময়ের গতিবিধি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। তবে এখন পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কিংবা ঘটনার সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততা চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

পিবিআইয়ের একাধিক কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, তাহসিফের মরদেহে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এ কারণে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফল ছাড়া মৃত্যুকে নিশ্চিতভাবে হত্যাকাণ্ড হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন বলে মনে করছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং প্রয়োজনে ভিসেরা পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পিবিআইয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে ভিসেরা পরীক্ষার প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ অজ্ঞাত কিংবা নিশ্চিত নয় বলে উল্লেখ করা হয়। তাহসিফের ক্ষেত্রেও যদি এমন ফল আসে, তাহলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্তকারীদের বাড়তি জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

এখানে উল্লেখযোগ্য, পিবিআই ছায়া তদন্ত থেকে সরে দাঁড়ালেও মামলার মূল তদন্ত বন্ধ হয়নি। মামলাটি তদন্ত করছে নৌপুলিশ। পিবিআইয়ের ছায়া তদন্তের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য ও আলামত মূল তদন্তকারী সংস্থার কাজে সহায়ক হতে পারে। তবে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ, ঘটনার সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততা এবং অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকলে তার ধরন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থার।

তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে ঘটনার রাতে তাহসিফ ও তাঁর বন্ধু দীপের গতিবিধি। নৌপুলিশের কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, ২৭ অক্টোবর রাতে উত্তরার নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে সময় কাটানোর পর তাহসিফ তাঁর বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশাকে বাসায় পৌঁছে দেন। এরপর তিনি টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান। ওই সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন বন্ধু দীপ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তাহসিফ ও দীপ একই সময়ে ওই এলাকায় প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর দীপকে একা বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, রাত ১টা ২১ মিনিটে ইজতেমা মাঠ থেকে বের হওয়ার সড়ক দিয়ে দীপকে হেঁটে চলে যেতে দেখা যায়। তখন তাঁর হাতে একটি হেলমেট ছিল এবং প্যান্টে কাদার দাগ দেখা যায় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এ ঘটনার পর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের মোবাইল ফোন থেকে তাঁর মায়ের কাছে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘আমি বের হয়েছি, আসছি।’ কিন্তু এরপরও তিনি বাড়ি ফিরে না আসায় পরিবারের উদ্বেগ বাড়তে থাকে। তদন্তকারীদের ধারণা, রাত দেড়টার আশপাশের সময়টি তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে মেসেজটি কে পাঠিয়েছিলেন, কোন পরিস্থিতিতে পাঠানো হয়েছিল এবং ওই সময় তাহসিফ কোথায় ছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিত হয়নি।

তদন্তকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো, তাহসিফ ও দীপ একসঙ্গে এলাকায় প্রবেশ করার পর কী ঘটেছিল। দীপের একা বেরিয়ে আসার সময়, তাঁর পোশাকে কাদার দাগ এবং পরবর্তী সময়ে তাহসিফের ফোন থেকে পাঠানো বার্তার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ এসব বিষয়ে স্পষ্ট ও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিচ্ছেন না। তবে তাঁর বক্তব্যের সত্যতা এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।

এদিকে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে তৃতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুল ইসলামের আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাজীপুরের টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন দীপকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেছিলেন।

রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, তাহসিফের মৃত্যুর পেছনে পূর্বশত্রুতা, আর্থিক লেনদেন, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত করা, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে এমন আলামত উদ্ধার এবং সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারী বা সহযোগীদের ভূমিকা যাচাই করাও তদন্তের অংশ।

আবেদনে আরও বলা হয়, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য এবং আসামির বক্তব্যের মধ্যে মিল-অমিল যাচাই করা দরকার। ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে দীপের অবস্থান, তাঁদের চলাচলের পথ এবং পরবর্তী সময়ের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে তাঁকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

এর আগে ৩১ অক্টোবর প্রথম দফায় দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পরে ৩ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় আরও তিন দিনের রিমান্ড দেওয়া হয়। তৃতীয় দফার এই আদেশের মধ্য দিয়ে তদন্তকারীরা তাঁকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ পেয়েছেন। তবে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং অন্যান্য আলামতের সঙ্গে যাচাই হওয়া জরুরি।

মামলার আরেক আসামি জেরিকা তাসনিম দিশাও বর্তমানে রিমান্ডে রয়েছেন। ১ নভেম্বর তাঁর প্রথম দফায় চার দিনের এবং ৪ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় আরও তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। তদন্তকারীরা দীপ ও দিশার বক্তব্যের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করতে চান। বিশেষ করে ঘটনার রাতে তাঁদের অবস্থান, যোগাযোগ এবং তাহসিফের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের বিভিন্ন দিক অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বন্ধু দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। রাত গভীর হলেও তিনি বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তাঁর মা একাধিকবার ফোন করলে তিনি ফিরে আসার কথা জানিয়েছিলেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। কিন্তু এরপর তাঁর সঙ্গে আর স্বাভাবিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে টঙ্গীর রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পরিবারে শোকের পাশাপাশি মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। পরে তাহসিফের বাবা উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। মামলাটির তদন্তভার নৌপুলিশের হাতে রয়েছে।

তাহসিফের মৃত্যুর পর থেকেই তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনের দাবি জানানো হচ্ছে। পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সুস্থ অবস্থায় বাড়ি থেকে বের হওয়া তরুণটির সঙ্গে শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল এবং কীভাবে তাঁর মৃত্যু হলো। ময়নাতদন্ত, ভিসেরা পরীক্ষা, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের সমন্বিত বিশ্লেষণ ছাড়া এ প্রশ্নগুলোর নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়া কঠিন।

সব মিলিয়ে তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর তদন্ত এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। একদিকে পিবিআইয়ের ছায়া তদন্ত থেকে সরে দাঁড়ানো, অন্যদিকে নৌপুলিশের ধারাবাহিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষা—সবকিছু মিলিয়ে মামলার পরবর্তী অগ্রগতির দিকে নজর রাখছেন স্বজন ও সংশ্লিষ্টরা। তদন্তে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই; প্রমাণের ভিত্তিতেই দায় নির্ধারণ করতে হবে। তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন, জড়িত কেউ থাকলে তাকে আইনের আওতায় আনা এবং পরিবারের কাছে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পৌঁছে দেওয়াই এখন তদন্তের প্রধান প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com