জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাদের অন্যতম সামান্তা শারমিন। দলটির রাজনৈতিক অবস্থান, আদর্শিক দিকনির্দেশনা এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষের পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা, নির্বাচনী জোটের কৌশল এবং দলটির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় দুর্বল হয়ে পড়ার বিষয়টি তাঁর পদত্যাগের অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। সামান্তার অভিযোগ, নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে না পারায় এনসিপি ক্রমেই জামায়াতের রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান সামান্তা শারমিন। তিনি দলটির যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্বে ছিলেন। পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি জানান, বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নাহিদ ইসলামকে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক গ্রুপেও নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক ধারার অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবে পরিচিত এই নেত্রীর সঙ্গে এনসিপির আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক সম্পর্কের অবসান ঘটল।
সামান্তা শারমিনের পদত্যাগকে এনসিপির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতপার্থক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, তিনি শুধু দলটির বর্তমান কমিটির একজন নেতা ছিলেন না; বরং এনসিপি গঠনের আগের সাংগঠনিক প্রক্রিয়াতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তরুণদের রাজনৈতিক সংগঠিত করার উদ্যোগ থেকে যে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সৃষ্টি হয়েছিল, তার সঙ্গে শুরু থেকেই যুক্ত ছিলেন তিনি। ফলে তাঁর দলত্যাগ দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত এবং অভ্যন্তরীণ মতপ্রকাশের পরিবেশ নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সামান্তার অভিযোগ, এনসিপি একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ও আদর্শিক পরিচয় ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাঁর মতে, দলটি এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে নিজস্ব অবস্থান থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হচ্ছে। এতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক শক্তির স্বতন্ত্র সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি মনে করেন, তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক দলের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে নতুন ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাস্তবে এনসিপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন যথেষ্ট দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত দলটির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সংকুচিত করেছে বলে তাঁর মত।
সামান্তা শারমিনের বক্তব্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির জোটবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্তের পর থেকেই তিনি দলীয় কার্যক্রমে অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। তাঁর দৃষ্টিতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে এনসিপির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়েছে এবং দলটির নতুন রাজনীতি প্রতিষ্ঠার যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে।
দলটির অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সামান্তা। তাঁর অভিযোগ, কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের মতামত নেওয়ার পরিবর্তে কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। একটি নতুন রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক চর্চা, নেতৃত্ব নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং সাংগঠনিক স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, এসব বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ায় দলের ভেতরে মতপার্থক্য আরও গভীর হয়েছে।
গত ২৩ অক্টোবর এনসিপির পুনর্গঠিত কমিটিতে সামান্তা শারমিনকে যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগে তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পুনর্গঠিত কমিটিতে তাঁর পদ পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছিল। পদাবনতির প্রায় দুই সপ্তাহ পর তাঁর পদত্যাগের ঘটনা দলটির সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস এবং নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্যের বিষয়টিকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সামান্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি নারীর সমান অংশগ্রহণ ও অধিকারসংক্রান্ত। তাঁর মতে, দলটির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান ক্রমেই নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্বের যে ভূমিকা ছিল, নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের সময় সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন থাকার কথা ছিল। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, দলটির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক গতিপথ সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
একটি রাজনৈতিক দলের গ্রহণযোগ্যতা শুধু নির্বাচনী সাফল্য কিংবা জোটগত অবস্থানের ওপর নির্ভর করে না; বরং নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে তার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। সামান্তা শারমিনের বক্তব্যে এসব বিষয় বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তাঁর মতে, নতুন রাজনৈতিক শক্তিকে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকবে এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
পদত্যাগের বিষয়টি প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে সামান্তা জানান, দলের রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে তিনি একাধিকবার পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মতে, এসব বিষয়ে এনসিপি প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে আগ্রহী হয়নি। ফলে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও আদর্শিক বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
সামান্তা শারমিনের রাজনৈতিক যাত্রায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করার যে প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল, জাতীয় নাগরিক কমিটি ছিল তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। পরবর্তী সময়ে সেই উদ্যোগ থেকেই জাতীয় নাগরিক পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটে।
এনসিপির আত্মপ্রকাশের সময় সামান্তা শারমিন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পান। নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির সামনে তখন বড় চ্যালেঞ্জ ছিল গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া। তরুণদের প্রত্যাশা, রাষ্ট্র সংস্কার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দলটির রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল।
এনসিপি ছাড়ার পর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়েও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন সামান্তা শারমিন। তিনি জানিয়েছেন, দলত্যাগের অর্থ রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানো নয়। বরং গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব, নারীর সমান অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং জাতীয় স্বার্থকে ভিত্তি করে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়ে তিনি ভাবছেন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে সামান্তা লিখেছেন, মানুষ তরুণদের পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এমন একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যাশা নিয়ে, যারা পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর পুনরাবৃত্তি করবে না। বরং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক রাজনীতির পথ তৈরি করবে। তাঁর মতে, এসব প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা রয়ে গেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, তরুণদের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করা নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি করা, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু বিভাজন রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে না। মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিন্ন লক্ষ্য যেন হারিয়ে না যায়, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব ও কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন, তবে কোনো বিদেশি শক্তির স্বার্থ বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান পেতে পারে না। দেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের স্বার্থকে কেন্দ্র করেই ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করা উচিত।
সামান্তা শারমিন তাঁর এই রাজনৈতিক ভাবনার সঙ্গে একমত এবং নতুন উদ্যোগে কাজ করতে আগ্রহী ব্যক্তিদের সঙ্গে বিস্তারিত মতবিনিময়ের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে তরুণদের আবারও সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেই উদ্যোগ অতীতের কোনো রাজনৈতিক দলের পুনরাবৃত্তি না হয়ে নতুন চিন্তা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে।
এনসিপির পক্ষ থেকে সামান্তা শারমিনের পদত্যাগ এবং তাঁর উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে কি না, তা প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ নেই। ফলে তাঁর অভিযোগগুলো আপাতত তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। দলটির নেতৃত্ব ভবিষ্যতে এসব বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, সেটিও রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে সামান্তা শারমিনের পদত্যাগ এনসিপির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক ঘটনা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রত্যাশা নিয়ে গড়ে ওঠা দলটির ভেতরে আদর্শ, নেতৃত্ব, জোটনীতি এবং নারীর অংশগ্রহণের প্রশ্নে মতপার্থক্য কতটা গভীর, তাঁর সিদ্ধান্ত তা সামনে এনেছে। একই সঙ্গে দলত্যাগের পর নতুন রাজনৈতিক ঐক্য গড়ার যে ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন, তা বাস্তবে কী রূপ নেয়, সেদিকেও নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের। বাংলাদেশের তরুণদের প্রত্যাশিত নতুন রাজনীতি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে এনসিপি ও সামান্তা শারমিনের ভবিষ্যৎ পথচলা এখন পৃথকভাবে কোন দিকে এগোয়, সেটিই আগামী দিনের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হতে পারে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত