টেকনাফে নিহত সেনাসদস্য তিতাসের বাড়িতে শোকের মাতম

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
নিহত সেনা সদস্যের মরদেহ নেওয়া হবে গ্রামের বাড়িতে, পরিবারে মাতম
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কক্সবাজারের টেকনাফে মানবপাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গোলাগুলিতে নিহত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক মো. তিতাস শেখের মরদেহ আজ শুক্রবার তাঁর গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে নেওয়া হচ্ছে। সেখানে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ২৭ বছর বয়সে তাঁর এমন মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিশেষ করে বিয়ের মাত্র কয়েক দিন পর তাঁর মৃত্যুর খবর পরিবারকে ভেঙে দিয়েছে। নতুন সংসার শুরুর আগেই প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে শোকাহত স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামের পরিবেশ।

নিহত তিতাস শেখের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের বাড়িতে স্বজন ও পরিচিতজনেরা ভিড় করছেন। পরিবারের সদস্যরা এখনো এই আকস্মিক মৃত্যুর ধাক্কা সামলে উঠতে পারেননি। যাঁকে ঘিরে ছিল নতুন জীবনের স্বপ্ন, যাঁর সঙ্গে পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জড়িয়ে ছিল, তাঁর মরদেহ বাড়িতে ফিরবে—এ বাস্তবতা মেনে নেওয়া তাঁদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

শুক্রবার সকালে নিহত সেনাসদস্যের মামা ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার জানান, তিতাসের মরদেহ বিকেলে গ্রামের বাড়িতে আনা হবে। এরপর জানাজা ও দাফনের সময় নির্ধারণ করা হবে। তিনি বলেন, তিতাস অত্যন্ত ভদ্র ও নম্র স্বভাবের ছেলে ছিল। মাত্র কয়েক দিন আগে তার বিয়ে হয়েছে। নতুন সংসার শুরু করার আগেই এভাবে তার চলে যাওয়া পরিবারের কেউ মেনে নিতে পারছেন না।

তিতাসের মৃত্যু শুধু তাঁর পরিবারের জন্য নয়, পুরো এলাকার মানুষের কাছেও গভীর বেদনার ঘটনা হয়ে উঠেছে। স্থানীয়ভাবে পরিচিত একজন তরুণ হিসেবে তাঁর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা শোক প্রকাশ করছেন। পরিবারের সদস্যদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় অপেক্ষা প্রিয়জনের মরদেহ শেষবারের মতো দেখার। এরপর ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী জানাজা ও পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়।

এর আগে বৃহস্পতিবার আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে টেকনাফে যৌথ বাহিনীর অভিযানে সেনাসদস্য নিহত হওয়ার বিষয়টি জানায়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, টেকনাফের রঙ্গীখালী এলাকার দুর্গম পাহাড়ে প্রায় ১২০ জন রোহিঙ্গা ও বাঙালি নাগরিককে জিম্মি করে রাখার বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যায়। ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি সশস্ত্র মানবপাচারকারী দল তাঁদের জিম্মি করে রেখেছে বলে তথ্য ছিল।

এই তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং স্থানীয় পুলিশের সমন্বয়ে একটি যৌথ আভিযানিক দল গঠন করা হয়। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে দলটি ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় জিম্মিদের উদ্ধারের উদ্দেশ্যে অভিযান পরিচালনার সময় যৌথ বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে মানবপাচারকারীরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়।

আইএসপিআরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গোলাগুলির একপর্যায়ে সেনাসদস্য তিতাস শেখ বাঁ কাঁধে গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। প্রথমে তাঁকে নিকটস্থ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

অভিযান চলাকালে জিম্মি অবস্থায় থাকা ৫৭ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি বন্দুক এবং চারটি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে জিম্মি থাকা বাকি ব্যক্তিদের বিষয়ে সরবরাহ করা তথ্যে বিস্তারিত উল্লেখ নেই।

১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি মো. কাওসার সিকদারও যৌথ অভিযানে সেনাসদস্য তিতাস শেখ গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পাহাড়ে যৌথভাবে অভিযান পরিচালনার সময় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে গোলাগুলিতে তিতাস আহত হন। পরে রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

টেকনাফের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় মানবপাচার ও জিম্মি করে রাখার মতো অপরাধ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, এই ঘটনা তা আবারও সামনে এনেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, সশস্ত্র অপরাধী চক্র এবং জিম্মিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো জটিল পরিস্থিতিতে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে বাহিনীর সদস্যদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে। তিতাস শেখের মৃত্যু সেই ঝুঁকিরই একটি মর্মান্তিক উদাহরণ।

মানবপাচারকারীদের হাতে জিম্মি থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। অভিযানে ৫৭ জনকে উদ্ধার এবং পাঁচজনকে আটক করার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এই অভিযানের সফলতার পাশাপাশি একজন তরুণ সেনাসদস্যের প্রাণহানির ঘটনা পুরো পরিস্থিতিকে শোকাবহ করে তুলেছে। যাঁরা জিম্মি অবস্থায় ছিলেন, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার মধ্যেই তিতাসকে প্রাণ দিতে হয়েছে।

নিহত তিতাস শেখ ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম আফজাল হোসেন। বয়স ছিল মাত্র ২৭ বছর। তিনি বিবাহিত ছিলেন এবং মৃত্যুর কয়েক দিন আগেই তাঁর বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই পরিবার ও স্বজনদের কাছে এই সময়টি হওয়ার কথা ছিল আনন্দ, নতুন সম্পর্কের বন্ধন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার। কিন্তু সেই আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে শোক ও বেদনায়।

তাঁর নববিবাহিত জীবনের শুরুতেই এমন পরিণতি পরিবারের জন্য আরও কঠিন বাস্তবতা তৈরি করেছে। যে বাড়িতে নতুন সদস্যকে ঘিরে আনন্দ ও আয়োজন থাকার কথা, সেখানে এখন অপেক্ষা করা হচ্ছে মরদেহের। পরিবারের সদস্যদের কাছে এই শোকের গভীরতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। একজন সন্তানের মৃত্যু যেমন বাবা-মায়ের জন্য অসহনীয়, তেমনি নতুন জীবন শুরু করতে যাওয়া একজন মানুষের আকস্মিক মৃত্যু তাঁর জীবনসঙ্গী ও স্বজনদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী বেদনার কারণ হয়ে থাকে।

তিতাস শেখের মরদেহ শুক্রবার বিকেলে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। জানাজার সময় নির্ধারণের পর তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। পরিবারের সদস্য, স্বজন ও এলাকাবাসী শেষবারের মতো তাঁকে বিদায় জানাতে অপেক্ষা করছেন। দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারানো এই সেনাসদস্যের মৃত্যুতে তাঁর পরিবার যে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছে, তা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়।

টেকনাফের অভিযানে জিম্মিদের উদ্ধারের ঘটনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিতাস শেখের প্রাণহানিও দেশের মানুষের জন্য গভীর শোকের বিষয়। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি পরিবারের স্বপ্ন থেমে গেছে, একটি নতুন সংসারের সূচনা অসমাপ্ত থেকে গেছে। এখন লস্করদিয়া গ্রামের মানুষের অপেক্ষা শুধু শেষ বিদায়ের। শোকের এই সময়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং নিহত সেনাসদস্যের আত্মত্যাগের প্রতি যথাযথ সম্মান জানানোই হয়ে উঠেছে সবার প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com