রাজধানীর আজিমপুরে গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্সের (সাবেক গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ) শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষ ড. মেহেরুন্নেছার পদত্যাগের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকাল ১০টা থেকে শিক্ষার্থীরা আজিমপুর সড়কের দুই পাশে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। এতে ওই এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে ভোগান্তির সৃষ্টি হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসহযোগিতামূলক আচরণের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের পাশাপাশি আবাসিক হলের আসন বাতিলের হুমকি এবং অডিটোরিয়ামের বিদ্যুৎ বিলের জন্য জরিমানা দাবি করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানো হলেও তারা প্রত্যাশিত সমাধান পাননি। একপর্যায়ে অধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছেন তারা।
শুক্রবার সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নেওয়ায় আজিমপুর এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। রাজধানীর ব্যস্ত এই এলাকায় সড়ক অবরোধের কারণে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, যাত্রী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলে দুর্ভোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে সকালবেলায় কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগামী মানুষের যাতায়াতে এমন পরিস্থিতি বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। তবে শিক্ষার্থীরা তাদের দাবির বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অবস্থান নিয়েছেন।
এই আন্দোলনের পেছনে রয়েছে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি। শিক্ষার্থীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই অধ্যক্ষ ড. মেহেরুন্নেছাকে তাঁর কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন তারা। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে জবাব এবং পদত্যাগের দাবিতে তারা কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। দিন গড়িয়ে রাত হলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান সমাধান হয়নি। পরে রাতে পুলিশি সহায়তায় অবরুদ্ধ অধ্যক্ষকে কার্যালয় থেকে নিয়ে যাওয়া হয়।
তবে অধ্যক্ষকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, রাতে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করে এবং নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছেন এবং তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অধ্যক্ষকে কার্যালয় থেকে বের করে নেওয়ার সময় তাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। ওই ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়।
তবে শিক্ষার্থীদের এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য, আহতদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা, তাঁদের শারীরিক অবস্থা কিংবা ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। একইভাবে অধ্যক্ষ ড. মেহেরুন্নেছার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের বক্তব্য জানা জরুরি। অভিযোগের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণে উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আবাসিক হলের আসন বাতিলের হুমকির অভিযোগ। আবাসিক শিক্ষার্থীদের কাছে হলের আসন শুধু থাকার জায়গা নয়; এটি তাঁদের নিয়মিত পড়াশোনা, ক্লাসে উপস্থিতি এবং শিক্ষাজীবন পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিশেষ করে পরিবারের বাইরে থেকে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন পরিস্থিতিতে হলের আসন বাতিলের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা জানা প্রয়োজন।
অন্যদিকে অডিটোরিয়ামের বিদ্যুৎ বিল বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা দাবি করার বিষয়টিও আন্দোলনের অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগ, এই অর্থের দায় এবং জরিমানা নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের কাছে বিষয়টি কেবল অর্থের পরিমাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কেন জরিমানা দাবি করা হয়েছে, এর ভিত্তি কী এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে। এ ধরনের আর্থিক দাবি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিয়ম, হিসাব এবং কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে সেই মতবিরোধের সমাধান হওয়া উচিত আলোচনা, নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেমন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, তেমনি অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও সমীচীন নয়। অভিযোগগুলো যদি যথাযথ হয়, তাহলে সেগুলোর প্রতিকার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ ও হামলার অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি জানানোর সুযোগ থাকা জরুরি। একই সঙ্গে কোনো পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা কী ছিল, বলপ্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছিল কি না এবং আহত হওয়ার অভিযোগের সত্যতা কতটুকু—এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। শিক্ষার্থীদের কেউ আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে থাকলে তাঁদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব।
সড়ক অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ হলেও জনসাধারণের চলাচল ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়ে কর্মজীবী মানুষ, রোগী পরিবহন, শিক্ষার্থী এবং জরুরি কাজে বের হওয়া ব্যক্তিদের ওপর। তাই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কলেজ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, যাতে একদিকে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের সুষ্ঠু সমাধান হয়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও কমে আসে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে উত্তেজনা প্রশমিত করে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ, আবাসিক হলের আসন বাতিলের হুমকি এবং অডিটোরিয়ামের বিদ্যুৎ বিলের জরিমানা নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। পাশাপাশি রাতে পুলিশের ভূমিকা ও শিক্ষার্থীদের আহত হওয়ার অভিযোগও যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সেটিও স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত।
গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্সের এই পরিস্থিতি কেবল অধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, আবাসিক সুবিধা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার প্রশ্নও জড়িয়ে গেছে। দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য সমাধান না এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল উদ্যোগ, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংলাপ এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মধ্য দিয়েই এই অচলাবস্থা নিরসনের পথ তৈরি হতে পারে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত