প্রকাশ: ২১ আগস্ট ‘ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশে গত পনেরো বছরে সংঘটিত গুম-খুনের ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িত হিসেবে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর উচ্চপদস্থ কিছু কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং জাতীয় সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, গুমের শিকার মানুষের সংখ্যা বিপুল, এবং এদের মধ্যে অধিকাংশ ঘটনায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তথ্য অনুসারে, র্যাবের কর্মকর্তারা প্রায় ৬০ শতাংশ গুমের ঘটনায় জড়িত ছিলেন।
গত ৬ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গুমে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ১১ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ছয়জন উচ্চপদস্থ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য পাঁচজনই প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিজিএফআই)-এর সাবেক মহাপরিচালক বা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তারা হলেন— লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী, মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) তৌহিদুল ইসলাম।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গুম-খুনের ঘটনাগুলোর অনুসন্ধানের জন্য গত বছরের ২৭ আগস্ট বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত ‘গুম তদন্ত কমিশন’কে দায়িত্ব প্রদান করে। কমিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয় ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত সব গুমের ঘটনা তদন্ত করার জন্য। তদন্তের ধারাবাহিকতায় কমিশন ইতিমধ্যে দুটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দিয়েছে। এই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল— “আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ : অ্যা স্ট্রাকচারাল ডায়াগনসিস অব এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স ইন বাংলাদেশ”।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের ঘটনাগুলো পরিচালিত হতো তিনটি ধাপে। প্রথম ধাপে থাকতো ‘কৌশলগত নেতৃত্ব’—যাদের মধ্যে ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিক, পলাতক সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকরা। দ্বিতীয় ধাপে ছিলেন বিভিন্ন বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার চিহ্নিত কর্মকর্তারা, যারা এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষ দায়িত্ব পালন করতেন। আর তৃতীয় ধাপে ছিলেন মাঠপর্যায়ের সদস্যরা, যারা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশ মেনে গুম-খুনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতেন।
গুম কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট এক হাজার ৮৫০টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যার মধ্যে এখনও ৩৪৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অভিযোগকারীদের অনেকেই আজও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগকারীদের নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা তদন্ত প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা না করেন। এসব হুমকির লিখিত প্রমাণও কমিশনের হাতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সর্বশেষ প্রতিবেদনে কমিশন বিশেষভাবে ২৩ জন কমান্ডারকে চিহ্নিত করেছে, যাদের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় এবং অংশগ্রহণে গুম ও খুন সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানের নামও রয়েছে, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থেকে বহু বিতর্কিত অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এই চিহ্নিতকরণ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বড় অগ্রগতি, তবে কার্যকর বিচার প্রক্রিয়া ছাড়া ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়া অসম্ভব। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বারবার বাংলাদেশ সরকারকে গুম-খুনের শিকারদের তালিকা প্রকাশ এবং দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, এই তদন্ত প্রক্রিয়া এখনো প্রাথমিক ধাপে রয়েছে এবং আদালতের রায় ছাড়া কাউকে অপরাধী বলা যায় না।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড একটি গভীর ক্ষত হিসেবে থেকে গেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ ধরনের অভিযোগ দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, চিহ্নিত ২৩ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকার এবং আদালত কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে এবং নিখোঁজ মানুষের পরিবারের কাছে ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি কতটা পূরণ হবে।