সেপ্টেম্বরের ২০ দিনে এসেছে ১৯০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৬৭ বার

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো আয় দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক সাড়া জাগাচ্ছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ২০ দিনেই দেশে এসেছে ১৯০ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা প্রতিদিন গড়ে দাঁড়ায় ৯ কোটি ৫১ লাখ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, গত বছরের একই সময়ে প্রবাসী আয় ছিল ১৬১ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, এ বছর একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ১৭ দশমিক ৯০ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুধু সেপ্টেম্বরের ১৮ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে দেশে এসেছে ১৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট এসেছে ৬৮০ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। এই অগ্রগতি প্রমাণ করছে যে, প্রবাসী আয় বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

সেপ্টেম্বরের ২০ দিনে এসেছে ১৯০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স

এর আগে জুলাই মাসে দেশে এসেছিল ২৪৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং আগস্ট মাসে এসেছিল ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার। টানা তিন মাসের এই ধারাবাহিক ইতিবাচক প্রবাহ বিশেষজ্ঞদের মতে দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তি এনেছে। বিশেষ করে আমদানি ব্যয় নির্বাহ, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং মুদ্রা বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় এই রেমিট্যান্স অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে মোট ৩০৩২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার বা ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আয়ের রেকর্ড। এই প্রবাহ দেশের অর্থনীতিকে কেবল স্বস্তি দেয়নি, বরং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতেও বড় ভূমিকা রেখেছে। সর্বশেষ হিসাবে রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন শ্রমবাজারে কর্মী প্রেরণ বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রবাসীরা ক্রমশ বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠানো কমে আসছে, যার পেছনে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো কার্যকর হয়েছে। ব্যাংকগুলোও এখন রেমিট্যান্স প্রেরণে আকর্ষণীয় প্রণোদনা দিচ্ছে। সরকারি প্রণোদনা হিসেবে ২.৫ শতাংশ হারে সহায়তা অব্যাহত থাকায় প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে আরও উৎসাহী হচ্ছেন।

এছাড়া আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার সংস্থাগুলোর সঙ্গে নতুন করে চুক্তি ও সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে প্রবাসীরা দ্রুত, নিরাপদ ও স্বল্প ব্যয়ে অর্থ দেশে পাঠাতে পারছেন। এই উদ্যোগগুলোও রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

রেমিট্যান্সের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে। প্রবাসীরা যে আয় পাঠাচ্ছেন, তা পরিবারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, জমি কেনা-বেচা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগে ব্যবহার হচ্ছে। এর ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত হচ্ছে এবং স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হচ্ছে।

অন্যদিকে, এই প্রবাসী আয় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতেও ভূমিকা রাখছে। কয়েক মাস আগেও যখন বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা ছিল, তখন ব্যাংকগুলো পর্যাপ্ত ডলার সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছিল। কিন্তু এখন রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ায় ব্যাংকগুলো নিজেদের ডলার চাহিদা পূরণ করে অতিরিক্ত ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকে বিক্রি করছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় চাপ কমছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বৈদেশিক মুদ্রার এই রিজার্ভ বৃদ্ধি দেশের আমদানি ব্যয় নির্বাহের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। খাদ্য, জ্বালানি ও কাঁচামাল আমদানিতে যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাড়তি চাপ ছিল, সেখানে রেমিট্যান্সের প্রবাহ সেই চাপ সামলাতে সহায়তা করছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হলে তা ঝুঁকির কারণ হতে পারে। শ্রমবাজারে কোনো অস্থিরতা তৈরি হলে বা প্রবাসীদের আয়ে কোনো ধাক্কা লাগলে দেশের বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদে শিল্পায়ন, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ টানার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

শ্রমবাজার বৈচিত্র্য করাও জরুরি হয়ে উঠেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। নতুন বাজার যেমন ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকায় দক্ষ কর্মী প্রেরণ করা গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়ানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার করে প্রবাসীদের আয় বৃদ্ধি করা গেলে দেশের অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে রেমিট্যান্সের যে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, মুদ্রা বাজারে স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক লেনদেন নির্বিঘ্ন রাখতে এই প্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। যদিও সামনে বৈশ্বিক অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে, তবে প্রবাসীদের অবদান বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাপমুক্ত রাখতে এখনও নির্ভরযোগ্য শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত