প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সুনামগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক আবারও এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার সাক্ষী হলো। শুক্রবার সকালে জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের শত্রুমর্দন বাঘেরকোনা এলাকায় একটি ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-মেয়েসহ তিনজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। সকাল সোয়া ৭টার দিকে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা মুহূর্তেই একটি পরিবারকে শোকে স্তব্ধ করে দিয়েছে এবং স্থানীয় সমাজে গভীর বেদনাবিধুর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
নিহতদের মধ্যে আছেন সুনামগঞ্জ পৌর শহরের উকিলপাড়ার বাসিন্দা আবাদিত কেশবা প্রিয়া (৪০) এবং তার মেয়ে, সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রথমা চৌধুরী। একইসঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন সিএনজি চালক সজল ঘোষ (৫০)। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জ থেকে যাত্রী নিয়ে সিলেটের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলো অটোরিকশাটি। এসময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মালবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সিএনজির সাথে সরাসরি ধাক্কা খায়। সংঘর্ষের মাত্রা এতটাই প্রবল ছিল যে ঘটনাস্থলেই চালক সজল ঘোষ এবং যাত্রী কেশবা প্রিয়া মারা যান। গুরুতর আহত অবস্থায় কেশবার মেয়ে প্রথমা চৌধুরীকে উদ্ধার করে দ্রুত শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলেও সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
দুর্ঘটনার পরপরই শান্তিগঞ্জ থানার পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম চালায়। স্থানীয় লোকজনও সহযোগিতা করে আহতদের হাসপাতালে পাঠাতে সহায়তা করে। পুলিশ দুর্ঘটনাকবলিত ট্রাকটিকে জব্দ করেছে এবং ট্রাক চালককে আটক করেছে বলে নিশ্চিত করেছেন শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল আহাদ। তিনি আরও জানান, নিহতদের মরদেহ সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে ময়নাতদন্তের জন্য।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা সড়ক দুর্ঘটনা একটি ভয়াবহ সংকটে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, শুধুমাত্র চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ, আহত হয়েছেন আরও কয়েক গুণ বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা, সড়কের দুরবস্থা, ট্রাফিক আইন না মানা এবং কার্যকর নজরদারির অভাবই এই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। সুনামগঞ্জের এই ঘটনা তার আরেকটি নির্মম উদাহরণ হয়ে রইল।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শত্রুমর্দন বাঘেরকোনা এলাকায় মহাসড়কটি অনেক সরু এবং ব্যস্ত। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত অব্দি এখানে ছোট বড় যানবাহনের চাপ থাকে। বিশেষ করে ট্রাক ও ভারী যানবাহনগুলো প্রায়ই বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। স্থানীয়রা একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই মহাসড়কের সম্প্রসারণ ও সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন, কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি। দুর্ঘটনার খবর জানাজানি হতেই আশপাশের মানুষ দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে একটি পরিবারের এমন চরম ক্ষতি আর কোনোভাবে পূরণ হওয়ার নয়।
নিহত আবাদিত কেশবা প্রিয়ার পরিবার পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। স্বজনরা শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তার মেয়ে প্রথমা ছিলেন সপ্তম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী। শিক্ষকদের মতে, পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি সে সহপাঠীদের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক বজায় রাখত। তার অকাল মৃত্যু শুধু পরিবারের জন্যই নয়, স্কুলের শিক্ষক ও বন্ধুদের জন্যও এক বিশাল শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চালক সজল ঘোষ দীর্ঘদিন ধরে সিএনজি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এলাকার পরিচিত এই চালক ছিলেন নির্ভরযোগ্য ও সতর্ক। তার মৃত্যুতে সহকর্মী চালকরা শোকাহত। তারা বলছেন, দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য চালকরা সবসময় সচেতন থাকার চেষ্টা করেন, কিন্তু প্রতিনিয়ত মহাসড়কে যেভাবে ভারী যানবাহন দ্রুতগামী হয়ে ওঠে, তাতে অটোরিকশার মতো হালকা যানবাহনগুলো টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই দুর্ঘটনা কেবল তিনজন প্রাণহানি নয়, বরং দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মহাসড়কের সংস্কার ও সম্প্রসারণ এবং দ্রুতগামী ভারী যানবাহনের ওপর নজরদারি বাড়ানো ছাড়া এই দুর্ঘটনা ঠেকানো সম্ভব নয়।
শান্তিগঞ্জের এই দুর্ঘটনার পর পুনরায় আলোচনা শুরু হয়েছে গ্রামীণ সড়কে ছোট ও বড় যানবাহনের মিশ্র চলাচল নিয়ে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা, যেগুলো মূলত স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য, সেগুলো দীর্ঘ আঞ্চলিক মহাসড়কে নিয়মিত চলাচল করায় ঝুঁকি বহুগুণে বাড়ছে। সরকারের নীতি নির্ধারকরা এ বিষয়টি একাধিকবার আলোচনা করলেও কার্যকর কোনো সমাধান এখনো পাওয়া যায়নি।
নিহতদের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শত্রুমর্দন বাঘেরকোনা গ্রামের মানুষ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নিহত পরিবারগুলোর পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলো মনে করছে, শুধু আর্থিক সাহায্য নয়, দীর্ঘমেয়াদি সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে প্রকৃত সমাধান।
এই দুর্ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলছে—বাংলাদেশে কবে সড়ক দুর্ঘটনা কমবে এবং কবে সাধারণ মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারবে? প্রতিদিনের খবরে যোগ হয় নতুন নতুন প্রাণহানির ঘটনা, আর তাতে পরিবারগুলো চিরতরে হারিয়ে ফেলে আপনজনকে। শান্তিগঞ্জের এই ট্র্যাজেডি হয়তো পরিসংখ্যানের খাতায় তিনটি সংখ্যা যোগ করবে, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে এক মায়ের অসমাপ্ত স্বপ্ন, এক কিশোরীর অকাল মৃত্যু এবং এক শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার শেষ সীমা।