ডাকাতিয়া নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে মুখ ফুটছে না প্রশাসনের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৩৬ বার
ডাকাতিয়া নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে মুখ ফুটছে না প্রশাসনের

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের ডাকাতিয়া নদী দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে ভয়ঙ্কর ভাঙনের কবলে পড়েছে। নদীভাঙনের শঙ্কায় প্রতিদিনের জীবনযাত্রা ও নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন সাতবাড়িয়া এবং আশেপাশের চার গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। নদীর সংলগ্ন এলাকার ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, স্কুল, মসজিদ ও হাটবাজারসহ মৌলিক জীবনব্যবস্থা এখন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে সাতবাড়িয়া এলাকায় ভেকু ব্যবহার করে সরকারি উদ্যোগে নদী খনন করা হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি ড্রেজারের মাধ্যমে খনন শুরু হলে আশপাশের গ্রামের মানুষ নদীভাঙনের শঙ্কায় আতঙ্কিত হয়েছেন। বিশেষ করে নদীর চারপাশে বসতবাড়ি এবং আবাদি জমি থাকায় খনন কার্যক্রমে সরাসরি ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। এ অবস্থায় চারটি সংযোগ সেতু ভেঙে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাওয়া-আসা করতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কিছু নেতা সিন্ডিকেট গড়ে এই বালু খনন করছে এবং তা বিক্রি করছে। তারা বলেন, এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে নদী খনন চালাচ্ছেন, যার ফলে হাজারো মানুষ ভোগান্তির মধ্যে পড়ছে। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ৬০ লাখ টাকার বালু বিক্রি করা হয়েছে। স্থানীয় গ্রামবাসীরা অভিযোগ করেছেন, প্রশাসনের নিরবতা এই সিন্ডিকেটকে স্বচ্ছন্দে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে।

সাতবাড়িয়া এলাকার আবুল কালাম অভিযোগ করেছেন, “কিছু নামধারী বিএনপির নেতৃবৃন্দ আওয়ামী লীগের সাথে মিলে মাটি বিক্রি করছে। তারা দেশের এবং সাধারণ মানুষের ক্ষতি করছে। আমাদের ঘরবাড়ি ও জমিজমি নদীর গর্ভে চলে যেতে পারে, অথচ প্রশাসন কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না।” এছাড়া স্থানীয় গৃহবধূ ববি বেগম বলেন, “এভাবে মাটি তুললে আমাদের বাড়িঘর ও জমিজমি ধসে যাবে। রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় মেয়েদের বিয়ে দেওয়ায়ও সমস্যা হচ্ছে। আমাদের জীবন বিপন্ন হচ্ছে।”

সাতবাড়িয়া ও আশপাশের চার গ্রামে অন্তত পাঁচ শতাধিক মানুষ মাটি উত্তোলন বন্ধের দাবিতে প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছে। তারা জানান, ডাকাতিয়া নদী ১০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন বন্ধ করা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে। নদীভাঙনের কারণে স্থানীয় কৃষি নির্ভর মানুষদের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এই এলাকার বাসিন্দাদের মতে, নদীর নাব্যতা রক্ষা করার নামে চালানো খনন কার্যক্রম শুধু তাদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে এবং সিন্ডিকেটকে আরও সুযোগ দিচ্ছে।

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সাবেক কৃষি বিষয়ক সম্পাদক আলাউদ্দিন আল মাহমুদ কিরন বলেন, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ হত্যা মামলার আসামি রুবেল এই কাজটির ঠিকাদার। তিনি বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর সাথে আঁতাত করে মাটি বিক্রি করছেন। এতে নদীপাড়ের মানুষদের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মাটি বিক্রির সিন্ডিকেট প্রশাসনের অগোচরে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ডাকাতিয়া নদীতে ড্রেজার মেশিন বসানো হয়েছে এবং ১২ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন দেওয়া হয়েছে। নদীর দু’পাশে মানুষের বাড়িঘর ও ফসলি জমি থাকায় খনন কার্যক্রমের প্রভাবে ভাঙন ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি দেখানো হয়। এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদরাসা, স্কুল, খেলার মাঠ ও হাটবাজার। ইতিমধ্যেই চারটি সেতু নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে মাটি বিক্রির সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ইমন বড়ুয়া বলেন, “ডাকাতিয়া নদী খনন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ১০ কিলোমিটার এলাকা খনন করা হচ্ছে। উত্তোলিত বালুগুলো উপজেলা মাটি বিক্রয় কমিটির মাধ্যমে নিলামে বিক্রি করা হবে। যারা সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত তাদের নাম আমাদের দেওয়া হলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল আমিন সরকার জানিয়েছেন, নদীর নাব্যতা রক্ষার জন্য খনন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “জনগণের ভোগান্তি যেন না হয়, সে বিষয়টি আমাদের নজরে আছে। যদি ক্ষতির বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া যায়, আমরা তদন্ত করে খনন বন্ধের ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”

পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী রাশেদ শাহরিয়ারও বলেন, তিনি কুমিল্লার দায়িত্বে নতুন এসেছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। স্থানীয়রা আশা করছেন, প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপে নদীভাঙন ও অবৈধ বালু উত্তোলন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে।

এ পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একদিকে যেমন জরুরি, অন্যদিকে অবৈধ সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দমন করা প্রশাসনের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় মানুষদের জীবনের নিরাপত্তা ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের তৎপরতা এখন সবচেয়ে জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত