“মাধবপুরে মা-ছেলের বিষপান, দু’জনের মৃত্যু”

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৮২ বার
“মাধবপুরে মা-ছেলের বিষপান, দু’জনের মৃত্যু”

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার আদাঐর ইউনিয়নের গোয়ালনগর এলাকায় সোমবার সকাল ১০টার দিকে মা ও ছেলে একসঙ্গে বিষপান করে আত্মহত্যা করেছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মৃতরা হলেন যোগ মায়া দাস (৭২) ও তার প্রতিবন্ধী ছেলে পলাশ দাস (২৯)। প্রতিবেশীরা তাদের বিষপান করার খবর পেয়ে দ্রুত উদ্ধার করে মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। যদিও সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে রেফার করেন, হাসপাতালে যাওয়ার পথে অলিপুরের কাছে পলাশ দাস মারা যান। এরপর মাকে সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে চিকিৎসক যোগ মায়া দাসকেও মৃত ঘোষণা করেন।

মাধবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ সহিদ-উল্লা জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে এবং লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) বিজয় মৃত পলাশ দাসের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছেন।

স্থানীয় এলাকাবাসী ও পুলিশের সূত্রে জানা যায়, গোয়ালনগর গ্রামের প্রফুল্ল দাস কয়েক বছর আগে মারা যান। তিনি তার স্ত্রী যোগ মায়া দাস এবং প্রতিবন্ধী ছেলে পলাশ দাস সহ পাঁচ ছেলে রেখে যান। অন্য ছেলেরা নিজেদের পরিবার নিয়ে অন্যত্র বসবাস করায় যোগ মায়া দাস একাই তার প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে দারিদ্র্যময় ও অভাবের সংসারে জীবন কাটাচ্ছিলেন।

প্রতিবেশীরা জানান, মা ও ছেলে তাদের দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট এবং আর্থিক ও সামাজিক সমস্যার কারণে দীর্ঘদিন মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন। বিশেষ করে পলাশ দাস শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীতার কারণে স্বনির্ভর হতে পারছিলেন না। যোগ মায়া দাসকে একাই তার ছেলের দেখাশোনা করতে হতো, যা বৃদ্ধ বয়সে তার জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছিল।

স্থানীয়রা আরও জানিয়েছেন, কিছুদিন ধরেই মা ও ছেলে আচমকা বিষপানের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। রবিবার রাতে তাদের কিছু অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করা গিয়েছিল। সোমবার সকালে তাদের ঘরের বাইরে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকা অবস্থায় প্রতিবেশীরা অবাক হয়ে দেখেন। পরে তাদের ঘরে গিয়ে তল্লাশি করার পর মৃদু বিষক্রিয়ার চিহ্ন পাওয়া যায় এবং তখনই তারা দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক জানান, তারা প্রাথমিকভাবে মা ও ছেলের অবস্থা স্থিতিশীল রাখতে যথাযথ চিকিৎসা প্রদান করেছিলেন। তবে পলাশ দাসের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য সদর আধুনিক হাসপাতালে রেফার করা হয়। কিন্তু রাস্তায় পৌঁছানোর আগে তিনি মারা যান। এরপর মাকে সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে তিনি মারা যান।

স্থানীয় সামাজিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই দুঃখজনক ঘটনার পেছনে সামাজিক ও মানসিক চাপের বড় ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে পরিবারের অভাব ও প্রতিবন্ধী সন্তানের দেখাশোনার ভার বৃদ্ধ বয়সী মায়ের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।

পুলিশ ও সমাজকর্মীরা জানান, এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের জন্য দরকার মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবারের প্রতি সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থা। বিশেষ করে বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী সদস্যদের জন্য সরকারি ও স্থানীয় সহায়তা প্রদান জরুরি।

এ ঘটনায় গোয়ালনগর গ্রামের মানুষরা শোক প্রকাশ করেছেন এবং স্থানীয় প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেন, “যেখানে বৃদ্ধা মা ও প্রতিবন্ধী ছেলে একসাথে বিষপান করতে বাধ্য হন, সেখানে সামাজিক নিরাপত্তা ও সহায়তার ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল না।”

স্থানীয় থানা ও প্রশাসন এই ঘটনার প্রেক্ষিতে এলাকায় পরিদর্শন বাড়িয়েছে এবং স্থানীয় জনগণকে মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সহায়তার দিক থেকে সচেতন করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী সন্তান সহ পরিবারগুলোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ, সামাজিক সহায়তা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকলে এ ধরনের দুঃখজনক ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে একক অভিভাবক ও তাদের উপর নির্ভরশীল প্রতিবন্ধী সন্তানের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সরকারের নীতি ও স্থানীয় সহায়তা কার্যকর হওয়া আবশ্যক।

এই ঘটনা দেশজুড়ে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনকে সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার অভাব মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বৃদ্ধা ও প্রতিবন্ধী সন্তানসহ পরিবারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত যে, তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া জীবন-সংকটে পতিত হতে পারেন।

মাধবপুরে ঘটে যাওয়া এই দুঃখজনক ঘটনা শুধু গোয়ালনগর গ্রামকেই নয়, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের পরিবার ও সমাজকেও সতর্ক করে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজকর্মীদের উচিত পরিবারগুলোর মানসিক ও আর্থিক চাপে নজর দেওয়া, মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপন করা এবং বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য স্থায়ী সহায়তার ব্যবস্থা করা।

দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হলে এই ধরনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে বৃদ্ধা মা ও প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সর্বশেষ, মাধবপুর থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সমস্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনও নিশ্চিত করেছে যে, ভবিষ্যতে এমন ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত